অষ্টাদশ শতকে নাটোরের লালপুর উপজেলায় আগমনকৃত সুফি—সাধকদের মধ্যে বাগু দেওয়ান শাহ অন্যতম। তিনি মুর্শিদাবাদের ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও বিলাসী জীবন পরিহার করে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। প্রথম দিকে স্বস্ত্রীক উপজেলার মোমিনপুর গ্রামে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে সৃষ্টিকর্তার সাধনায় চরম স্তরে উন্নীত হলে ভেল্লাবাড়ীয়া গ্রামে চলে যান। ভেল্লাবাড়ীয়া গ্রামে আগমন করে সেখানে ইসলাম চর্চার জন্য খানকা বা আস্তানা, নামাজের জন্য মাটি দিয়ে ছোট পরিসরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থার জন্য একটি পুকুর খনন করে বাকি জীবন অতিবাহিত করেন। অল্প দিনের মধ্যে তাঁর সুখ্যাতি সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে আধ্যত্মিক সাধনা ও জ্ঞান শিক্ষার জন্য অসংখ্য মানুষ এই ভেল্লাবাড়ীয়াতে আগমন করে অনেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অতিবাহিত করেন। মৃত্যুর পরে তাঁর নির্মিত মসজিদটি নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম হলে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে নাটোরের চৌধুরী বংশের ধণাঢ্য ব্যক্তি দোস্ত মোহাম্মদ খান উক্ত মসজিদের স্থলে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ এবং পুকুরের পশ্চিম তীরে শানবাঁধানো ঘাট নির্মাণ করেন।
মাজার কমপ্লেক্রের অবস্থান লালপুর বাজারের ত্রিমোহিনী চত্বর থেকে ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে ভেল্লাবাড়িয়া বাজার ও দুড়দুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের পার্শ্বে ঐতিহ্যবাহী ভেল্লাবড়ীয়া মাজার কমপ্লেক্রটি অবস্থিত। মাজার কমপ্লেক্রটি হযরত বাগু দেওয়ান শাহ (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের সমাধি, পুকুর, মসজিদ ও মাদ্রাসার সমন্বয়ে গঠিত। সীমানা প্রাচীর দ্বারা সমগ্র কমপ্লেক্রটি কিছুটা সুরক্ষিত। ভূমি জরিপ অনুযায়ী রামকৃষ্ণপুর মৌজায় মাজার কমপ্লেক্সের মোট ভূমি—সীমানা ১০.৪৯ একর। মসজিদটির পূর্বদিকে রয়েছে একটি পুকুর, পুকুরের পশ্চিমতীরে একটি শানবাঁধানো ঘাট আছে, যা একসময় ওযুখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া মসজিটির পশ্চিমে মেহগনি গাছের বাগান ও উত্তরে মাদ্রাসা এবং দক্ষিণে বাগু দেওয়ান শাহ ও তাঁর শিষ্যদের সমাধি রয়েছে। শত বছরের পুরাতন এ মসজিদটি মধ্য যুগীয় মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের জ্বলন্ত সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন দূর দূরান্ত হতে বহু মানুষ মাজার ও মসজিদটি দেখতে আসে। সবার কাছেই মাজার ও মসজিদটি যেমন দর্শনীয়, তেমন আকর্ষণীয়। শুক্রবারে বিভিন স্থান থেকে মানত ও সিরনি নিয়ে আগত বহুসংখ্যক মানুষের সম্মিলন স্থানটিকে তীর্থস্থানে রূপান্তরিত করে।
বাগু দেওয়ান শাহ (রহ.) এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
হযরত বাগু দেওয়ান (রহ.) বংশগত দিক থেকে কুরাইশি, হানাফি মাজহাব ও কাদেরিয়া তরিকার অনুসারি ছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম খলিলুর রহমান। তিনি ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শায়খ বদরুদ্দীনের নিবাস ছিলো পুকুরিয়ায় যা মুর্শিদাবাদ থেকে ১২/১৩ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এবং মাতা ছিলেন বাঘার (রাজশাহী) এক মুসলিম পরিবারের মেয়ে। মায়ের মৃত্যুর পরে তিনি এই এলাকায় আগমন করে বাকি জীবন অতিবাহিত করেন।
জন্মের সময় আশেপাশের লোকেরা হঠাৎ বাঘের আওয়াজ শুনতে পায়, একারণে তাঁকে সবাই মিয়া বাগু বলে ডাকতো। পরবর্তীকালে তিনি হযরত বাগু দেওয়ান নামে পরিচিতি লাভ করেন। পৈতৃক জমিদারি ত্যাগ করে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
মাতার মৃত্যুর পরে তিনি বাঘা এলাকায় জাহেরী ইলম অর্জনে ব্রতী হন। এরপর কোরআনের জ্ঞান অর্জনের জন্য ভাগলপুরে গমন করেন। কিন্তু অসুস্থতা ও ওস্তাদের বিয়োগের কারণে সেখানে বিশিদিন অবস্থান না করে মেদিনিপুর চলে যান। সেখানে মওলানা বাদী উদ্দীনের নিকট থেকে কোরআন—হাদিসের জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে শাণিত করেন। এরপর শিক্ষাগুরু বাদী উদ্দীনের নির্দেশে মুর্শিদাবাদ মাদ্রাসায় শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন। এখানেই তিনি বাতেনী জ্ঞান লাভ করেন। বাতেনী জ্ঞান লাভের পরে তিনি পুনরায় বাঘা এলাকায় ফিরে এসে জামান মওলানার পাশ^র্বর্তী মসজিদে বহুবার তিনি চিল্লায় বসেন। এসময় তিনি এক স্থানে স্থায়ীভাবে থাকেননি। কখনো মরুভূমিতে, কখনো খোলা মাঠে আবার কখনো বনে—জঙ্গলে ঘুরা—ফেরা করতেন। এভাবে খোদা প্রেমে মত্ত হয়ে আঠারো বছর অতিক্রান্ত করার পর মাকামে তালকীনে (আল্লাহ তায়ালার দিদারের বিশেষ অবস্থান) পৌছেন। এরপর তিনি ভেল্লাবড়ীয়াতে চলে আসেন এবং বাকি জীবন এখানেই অতিবাহিত করেন।
অল্প সময়ের মধ্যে বাগু দেওয়ান (রহ.) এর জাহেরী ও বাতেনী ইলমের সুখ্যাতি সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। একারণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহুসংখ্যক ব্যক্তি তাঁর নিকট অধ্যাত্মিক জ্ঞান শিক্ষার জন্য আগমন করেন। তাঁর ভক্ত ও মুরীদগণের মধ্যে শাহ নূরী (রহ.), শাহ মুহাম্মদ তাকী, শায়খ শরফ আলী গাফারাল্লাহ, হাজী মুহাম্মদ আনওয়ার, হাজী আলমাস হাবসী (জাহাঙ্গিরনগর), জাফর হোসাইন (বিহার), হাজী সুলতান লাহোরী, শায়ক হেদায়েতুল্লা (মুর্শিদাবাদ), খন্দকার মুহাম্মদ তাকী, শাহ মুহাম্মদ জাহীর, শায়খ মুহাম্মদ আরশাদ, কাজী আয়নুল হক, আবদুল করিম (বাঘা—রাজশাহী), মিয়া মুহাম্মদ আক্কেল আলী (ইসলামাবাদ), শায়খ আহসান উল্লাহ (গোয়ালপাড়া), খন্দকার শামসুল্লাহ, মুহাম্মদ কুরাইশ (্এলাচীপুর), মোল্লাহ মুহাম্মদ সালিহ (জোকদিয়া), শাহ লাউছুদ্দিন রসুলপুরী (বর্ধমান), মাওলানা আমজাদ ইবনে মুহাম্মদ (সিলেট) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
তিনি একজন দানশীল মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট থেকে যেসব উপহার—উপঢৌকন লাভ করতেন সেগুলো থেকে অতি সামান্য নিজের জন্য রেখে বাকিগুলে নিকটাত্মীয়, খাদেম ও ফকির—মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দেন। অন্যের খেদমত করা, বিনয় প্রকাশ, স্বল্পে তুষ্টি, অধ্যবসায় প্রভৃতি ছিলো তাঁর চরিত্রের অন্যতম প্রধান দিক। তাঁর মাঝে প্রজাহিতৈষীর সন্ধান পাওয়া যায়। একদা বাংলার তৎকালীন সুবাদার নবাব আলীবর্দী খান বাগু দেওয়ানের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নিজের কেল্লা থেকে বের হয়ে ভেল্লাবড়ীয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং বাঘা থেকে বিশ মাইল দূরে খালিতগীতে অবস্থান নেন।
এ বিষয়ে মাজারের খাদেব মো:রেজাউল করিম বলেন, মুসল্লী অনেক থাকায় মসজিদকে প্রশস্ত করার দরকার, উন্নতমানের পাবলিক টয়লেট দরকার দর্শনীয় জায়গা হিসেবে এই মাজারের পতিত জায়গা গুলো সৌন্দর্য আনার দরকার।