বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:১৭ অপরাহ্ন

লেক্সাস বিস্কুট: এক নামে ২০ ব্র্যান্ড, প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা; আস্থা হারাচ্ছে আসল পণ্য
স্টাফ রিপোর্টার / ১৩৮ বার দেখা হয়েছে
আপডেট শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

ঢাকা: দেশের বিস্কুট বাজারে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে জনপ্রিয় ‘লেকসাস’ (Lexus) ব্র্যান্ডের ভেজিটেবল ক্র্যাকার্স। বর্তমানে ২০টিরও বেশি ছোট-বড় কোম্পানি একই নামে বা কাছাকাছি নামে বিস্কুট তৈরি করে বাজারজাত করছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এতে করে একদিকে যেমন প্রকৃত বা মানসম্পন্ন ব্র্যান্ডটি তার বাজার ও সুনাম হারাচ্ছে, তেমনই নিম্নমানের পণ্য কিনে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

​ব্র্যান্ডের জগাখিচুড়ি: কোথায় আসল, কোথায় নকল?
​’লেকসাস’ বিস্কুট প্রথম যে কোম্পানি বাজারে এনেছিল, তা অল্প সময়েই ভেজিটেবল ক্র্যাকার্সের একটি সমার্থক নাম হয়ে ওঠে। এর ফলে একাধিক কোম্পানি এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে একই নাম ব্যবহার করা শুরু করে। অলিম্পিক, ড্যানিশ, ফ্রেশ (মেঘনা গ্রুপ), কিষোয়ান, এ.টি. হক, ইস্পাহানি-সহ নামি-বেনামি বহু কোম্পানি এখন ‘লেকসাস’ বা ‘লেক্সাস’ বিস্কুট বিক্রি করছে।

​ক্রেতা ভোগান্তি: রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “আমি সবসময় একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির লেকসাস কিনি। কিন্তু গত সপ্তাহে দোকানদার প্যাকেজিংয়ের সামান্য পার্থক্য দেখে ভিন্ন কোম্পানির একটি বিস্কুট ধরিয়ে দেন। বাড়িতে এসে দেখি স্বাদ ও মান দুটোই খারাপ। এতগুলো একই নাম দেখে এখন আসল ব্র্যান্ডটি চিনতেই কষ্ট হয়।”

গাজীপুর মহানগরের গাছা থানাধীন মইরান এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম জানান, আমি লেক্সাস দেখেই কিনি আসলে কোনটি আসল কোনটি নকল বোঝা মুশকিল।

​একই নামে এত ব্র্যান্ডের উপস্থিতি মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। যে কোম্পানিগুলো বাজারে সদ্য প্রবেশ করেছে বা অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত, তারা প্রায়শই নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে কম দামে পণ্য বিক্রি করে।

অনেক ক্ষেত্রে সস্তা পাম তেল, অতিরিক্ত কৃত্রিম ফ্লেভার এবং নিম্নমানের ভেজিটেবল ফ্লেক্স ব্যবহার করা হয়, যা সরাসরি ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

যখন কোনো ক্রেতা ভুলে নিম্নমানের ‘লেকসাস’ বিস্কুট কেনেন, তখন অজান্তেই তারা মনে করেন পণ্যটির মান কমে গেছে। এর ফলে প্রকৃত এবং মানসম্পন্ন ব্র্যান্ডের প্রতিও তাদের আস্থা হ্রাস পায়।

​বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার মূলে রয়েছে ট্রেডমার্ক (Trademark) সুরক্ষার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব।
​১. ট্রেডমার্কের অভাব: প্রথম কোম্পানিটি সময়মতো ‘লেকসাস’ নামটি এককভাবে নিবন্ধিত (Registered) করে আইনি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এই সুযোগের সৃষ্টি হয়।

২. যুগপৎ ব্যবহারের সুযোগ: বাংলাদেশের ট্রেডমার্ক আইন অনুযায়ী, যদি একাধিক কোম্পানি দীর্ঘকাল ধরে একই নাম ব্যবহার করে থাকে, তবে কিছু ক্ষেত্রে তা অনুমোদিত হতে পারে, কিন্তু পণ্যের ক্যাটাগরি একই হওয়ায় এই ক্ষেত্রে আইনি হস্তক্ষেপ জরুরি।

৩. বিএসটিআইয়ের ভূমিকা: বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর উচিত বাজারে একই নামের নিম্নমানের পণ্যগুলির মান পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া।


​ক্রেতা এবং বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

​যে কোম্পানি প্রকৃত ট্রেডমার্কের মালিক, তাদের উচিত অবিলম্বে ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

ট্রেডমার্ক অফিস এবং বিএসটিআই-এর উচিত বাজার থেকে বিভ্রান্তিকর এবং নিম্নমানের পণ্য সরিয়ে নিতে যৌথ অভিযান চালানো।

ক্রেতাদের উচিত প্যাকেজিং, লোগো এবং প্রস্তুতকারক কোম্পানির নাম দেখে পণ্য কেনা, কেবল নামের ওপর নির্ভর না করা।

​একই নামে ২০টিরও বেশি ব্র্যান্ডের লেকসাস বিস্কুট বাজারে থাকার ফলে তৈরি হওয়া এই ‘ব্র্যান্ড বিশৃঙ্খলা’ কেবল ক্রেতার প্রতারণাই নয়, এটি দেশের খাদ্য উৎপাদন শিল্পের শৃঙ্খলাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই বিষয়ে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, খাদ্যপণ্যের বাজারে আরও বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও
Popular Post
Last Update
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com