
বগুড়ার দইয়ের ক্রমবর্ধমান আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কেবল রসনাবিলাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে শেরপুর উপজেলার শতবর্ষী প্রাচীন মৃৎশিল্পেও। একসময় আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের ভিড়ে মাটির হাঁড়ি-পাতিলের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় এই শিল্পটি বিলুপ্তির পথে থাকলেও, দইয়ের সরা, বাটি ও কাপের বিপুল চাহিদা কারিগরদের জীবনে নতুন করে কর্মচঞ্চলতা ফিরিয়ে এনেছে। বিশেষ করে শেরপুরের গাড়ীদহ ইউনিয়নের চন্ডিযান গ্রামের কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় শিল্পের চাকা এখন সচল, যা গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কারিগরদের নিপুণ কারুকার্যে তৈরি এই মৃৎপাত্রগুলো এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। আঠালো মাটি সংগ্রহ থেকে শুরু করে মেশিনে কাই প্রস্তুত করা এবং সবশেষে দক্ষ হাতের স্পর্শে তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন সরা ও কাপ। দইয়ের গুণগত মান ও স্বাদ অটুট রাখতে পাত্রগুলোতে বিশেষ লাল মাটির প্রলেপ দিয়ে দুই দিন ধরে ভাটার আগুনে পুড়িয়ে মজবুত করা হয়। যদিও যান্ত্রিকীকরণের ফলে উৎপাদন খরচ ও সময় কিছুটা কমেছে, তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে মাঝেমধ্যেই বিঘ্নিত হচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া।
শেরপুরের চন্ডিযান ছাড়াও কল্যাণী, কাশিয়াবালা, নয়মাইল ও আরিয়া বাজারের মতো গ্রামগুলোতে এখন ঘরে ঘরে সরা তৈরির ধুম পড়েছে। বংশপরম্পরায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই পেশায় যুক্ত থাকলেও বর্তমানে মুসলিম নারী-পুরুষরাও আর্থিক স্বচ্ছলতার আশায় সমানতালে এই কারুশিল্পে অংশগ্রহণ করছেন। সংসারের কাজের পাশাপাশি নারীরা যেমন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছেন, তেমনি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার ফাঁকে মাটির কাজ করে পরিবারের আয়ে যোগান দিচ্ছে। উৎপাদিত এসব মাটির পাত্র প্রতি সপ্তাহে ট্রাক বোঝাই হয়ে ঢাকা, কক্সবাজার, বরিশাল, রংপুর ও দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। চন্ডিযান গ্রামের প্রবীণ কারিগররা জানান, পাকিস্তান আমলে হাঁড়ি-পাতিলের চাহিদা কমে যাওয়ায় যে চরম সংকট দেখা দিয়েছিল, দইয়ের এই চাহিদার কারণে তা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। তবে এই অমিত সম্ভাবনাময় শিল্পের সামনে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুঁজি সংকট। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণের অভাব থাকায় অনেক কারিগর মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যার ফলে তাদের লভ্যাংশ সীমিত হয়ে পড়ছে। কারিগরদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও সরকারি আর্থিক সহায়তা পেলে এই প্রাচীন মৃৎশিল্প আরও বিকশিত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
