গাজায় ত্রাণ বিতরণে হামাসের বাধা ও চালকদের মারধর, জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তার তীব্র নিন্দা
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ও জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রমে ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থি সংগঠন হামাস সরাসরি বাধা দিচ্ছে এবং নিরলসভাবে নিয়োজিত ত্রাণকর্মীদের প্রতিনিয়ত নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে সতর্ক করে বলেছেন যে, হামাসের এই ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে উপত্যকাটিতে চলমান জরুরি আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রম দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। জেরুজালেম থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এই চাঞ্চল্যকর খবরটি বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে। বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী তাদের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ালেও দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে ভূখণ্ডটি পরিচালনাকারী সংগঠন হামাস এখনও অবরুদ্ধ এই উপত্যকাটির কিছু অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় এখনো সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যেই জেরুজালেম থেকে প্রকাশিত এক বিশেষ বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের উপ-বিশেষ সমন্বয়কারী রামিজ আলাকবারভ বলেন, গাজার কার্যত নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মানবিক কার্যক্রমে বেআইনিভাবে বাধা দেওয়ার এই ন্যক্কারজনক ঘটনাকে তিনি ‘জোরালোভাবে’ নিন্দা জানাচ্ছেন। তিনি তাঁর এই প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতিতে মূলত হামাসের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের দিকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত করেন। রামিজ আলাকবারভ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন যে, হামাসের এসব কর্মকাণ্ড চলমান মানবিক সহায়তাকর্মীদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, অসহায় মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়েছে এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনরক্ষাকারী মানবিক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।
জাতিসংঘের অফিশিয়াল বিবৃতিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, গত শনিবার হামাস-সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি গাজার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়ায় অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে সম্পূর্ণ জোরপূর্বক প্রবেশ করে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সেই সশস্ত্র ব্যক্তিরা একই সাথে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) একটি সুরক্ষিত গুদামেও অনধিকার প্রবেশ করে এবং সেখানে মানবিক সহায়তা সামগ্রী বহনকারী দুটি ট্রাকের চালককে নির্মমভাবে মারধর করেছে বলেও নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা আলাকবারভ এই বর্বরোচিত ঘটনার প্রেক্ষিতে বলেন, ‘এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মোটেও কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়।’ এগুলো মূলত গাজায় কর্মরত আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক সহিংসতা ও সামগ্রিক মানবিক কার্যক্রমে অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়ার একটি ক্রমবর্ধমান বিপজ্জনক ও উদ্বেগজনক প্রবণতার বাস্তব প্রতিফলন। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ত্রাণ সামগ্রী চোরাচালানের অপচেষ্টা, জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রমে নানাবিধ অপব্যবহারের ঘটনাও স্পষ্টভাবে জড়িত রয়েছে।
তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, এসব বেআইনি কর্মকাণ্ডের কারণে উপত্যকার সাধারণ ও ভুখা মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি তীব্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইলি বাহিনী গাজা ভূখণ্ডে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও উপস্থিতি আরও অনেক বাড়িয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসন করা ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস গত সপ্তাহে তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১৫ সদস্যের প্রশাসনিক সংস্থা বিলুপ্ত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। তবে গাজার কিছু অংশে এখনও তাদের আধিপত্য বজায় থাকায় আন্তর্জাতিক ত্রাণ বিতরণে এই ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও জাবালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির গুদামে হামলা এবং ত্রাণবাহী ট্রাকের চালকদের মারধরের ঘটনা বিশ্ব মানবিকতাকে স্তব্ধ করেছে। জাতিসংঘের উপ-বিশেষ সমন্বয়কারী রামিজ আলাকবারভের এই বিবৃতির পর গাজায় ত্রাণকর্মীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামাসের বাধা উপেক্ষা করে অসহায় মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছানোই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।









