‘বাজবল’ যুগের সমাপ্তি: ইংল্যান্ডের টেস্ট কোচের পদ ছাড়লেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম
বিশ্ব ক্রিকেটে রাজত্ব করা ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের টেস্ট ফরম্যাটে এক যুগের অবসান ঘটল। ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের প্রধান কোচের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। তবে লাল বলের ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ইংলিশদের প্রধান কোচের দায়িত্ব যথারীতি পালন করবেন তিনি। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ম্যাককালামের এই আকস্মিক পদত্যাগের ফলে ইংল্যান্ডের টেস্ট দল এখন একই সাথে অধিনায়ক ও কোচ শূন্য হয়ে এক গভীর সংকটে পড়েছে। কারণ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন টেস্ট দলের নিয়মিত অধিনায়কের দায়িত্বে থাকা বেন স্টোকস।
গত নভেম্বর মাসে ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ সিরিজে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪-১ ব্যবধানে বড় ব্যবধানে হারের পরও ম্যাককালামের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিল ইসিবি। তবে সেই আস্থার পর মাত্র তিন মাসের মাথায় টেস্ট দলের দায়িত্ব ছাড়তে হল এই নিউজিল্যান্ডারকে। মূলত গত মাসেই ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারে ইংল্যান্ড, যা তাঁর বিদায়কে ত্বরান্বিত করেছে। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ হারের চরম বিপর্যয়ের পর বেন স্টোকসের সাথে জুটি বেঁধে ইংল্যান্ড টেস্ট দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ম্যাককালাম। ঐ সময় ইংলিশ ক্রিকেটের অবস্থা ছিল চরম শোচনীয়। কারণ তার আগের ১৭টি টেস্টের মধ্যে মাত্র একটিতে জয়ের মুখ দেখেছিল ইংল্যান্ড। সেখান থেকে স্টোকসের সঙ্গে জুটি বেঁধে টেস্ট ক্রিকেটের চিরন্তন ঘরানাই বদলে দেন ম্যাককালাম। ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে চরম আক্রমণাত্মক ঘরানার ক্রিকেট খেলা শুরু করে ইংলিশরা, যা ক্রিকেট বিশ্বে ‘বাজবল’ নামে ব্যাপক পরিচিতি ও দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই কৌশলে ভর করে হারের বৃত্তে থাকা ইংল্যান্ড অবশেষে ছন্দে ফেরে এবং ম্যাককালাম-স্টোকস জুটিতে খেলা প্রথম ১১টি ম্যাচের মধ্যে ১০টিতেই জয় পায় ইংল্যান্ড।
কিন্তু গেল বছর থেকে ইংল্যান্ডের টেস্ট পারফরমেন্সে ব্যাপক অবনতি ঘটতে থাকে। সব মিলিয়ে, টেস্ট প্রধান কোচ হিসেবে ম্যাককালামের অধীনে ২৭টি ম্যাচে জয়, ২টি ড্র এবং ২০টি ম্যাচে হারের স্বাদ মানে ইংল্যান্ড। এর মধ্যে পরিসংখ্যান আরও নাজুক হয়ে পড়ে শেষ দিকে, যেখানে শেষ ৯টি টেস্ট ম্যাচের ৭টিতেই হারের তিক্ত স্বাদ নিতে হয় ইংলিশদের। নিজ দেশ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে আয়োজিত টেস্ট সিরিজ দিয়ে ম্যাককালামের এই গৌরবোজ্জ্বল কোচিং অধ্যায় শুরু হয়েছিল। আর কাকতালীয়ভাবে গত মাসে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটিই তাঁর শেষ টেস্ট অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে রইল। ২০২২ সালে কিউইদের বিরুদ্ধে ৩-০ ব্যবধানে টেস্ট জয় দিয়ে রাজকীয় সূচনা হলেও, গত মাসে সেই নিউজিল্যান্ডের কাছেই ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হার দিয়ে টেস্ট কোচিংয়ের ইতি টানলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম।
পদত্যাগের পর এক আবেগঘন বিবৃতিতে ম্যাককালাম বলেন, ‘টেস্ট দলের প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করাটা আমি দারুণ উপভোগ করেছি এবং আমরা বিগত দিনে যা কিছু অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত।’ তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘অবশ্যই, দায়িত্ব চালিয়ে যেতে না পারায় আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই হতাশ, তবে আমি এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। এখন আমার পুরো মনোযোগ থাকবে সীমিত ওভারের দলগুলোর জন্য নিজের সেরাটা দেওয়া এবং ইংল্যান্ডকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখা। আমি সাদা পোশাকের টেস্ট দলের জন্য সবসময়ের সাফল্যই কামনা করি।’
বেন স্টোকসের অবসর এবং ব্রেন্ডন ম্যাককালামের টেস্ট কোচের পদত্যাগ ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে ‘বাজবল’ যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটাল। আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের যে রোমাঞ্চ তারা বিশ্বকে উপহার দিয়েছিলেন, তা টেস্ট ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ম্যাককালামের অধীনে ইংলিশরা কেমন পারফর্ম করে, সেটাই দেখার বিষয়।









