ডিএসসিসি নির্বাচন: ডেমরায় পাল্টে যাচ্ছে ভোটারদের হিসাব-নিকাশ, আলোচনায় সেলিম ও জামান
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনকে ঘিরে ডেমরা থানার ৬৭ ও ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক তোড়জোড় ও আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নানামুখী হিসাব-নিকাশ চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডে ডেমরা থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এম রেজা চৌধুরী সেলিম। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে গুঞ্জন রয়েছে, তিনি আগামী কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বিএনপির এই ত্যাগী নেতা দলের দুঃসময়ে ডেমরা থানার রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন এবং বহু মামলা-হামলার শিকার হন বলে জানা যায়। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি ঢাকার বিখ্যাত নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা অবস্থায় ছাত্র রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন।
অন্যদিকে, ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ডেমরা থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ আনিসুজ্জামান (জামান) স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এই নেতা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক রাজনৈতিক মামলা, গ্রেপ্তার এবং নানা প্রতিকূল চাপের মুখোমুখি হন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা জানান। বিএনপির দুঃসময়ে তিনি দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এর ফলে ডেমরা থানা বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আনিসুজ্জামান ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের সামগ্রিক উন্নয়নে ডেমরা থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এম রেজা চৌধুরী সেলিমকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় খাল ও ড্রেন পরিষ্কার, মশক নিধন কর্মসূচি, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ এবং অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সহায়তায় তিনি প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ডেমরা এলাকায় মাদক ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধেও তাকে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর মতে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ঐতিহ্যবাহী সারুলিয়া বাজারের ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে আনিসুজ্জামান বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেখানে একটি দোকান সামান্য মেরামত করার সময় ব্যবসায়ীদের ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হতো এবং বিভিন্ন সময়ে অবৈধ দোকান উচ্ছেদের নামে উপর মহলকে ম্যানেজ করার অজুহাতে মোটা অংকের টাকা উত্তোলন করা হতো, সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরেছে। এছাড়া দোকান মালিকদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য পূর্বে যে নির্ধারিত টাকা দিতে হতো, আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে তা ৫০ টাকা পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে পরিচ্ছন্নতার জন্য ২০০ টাকা দেওয়া হতো সেখানে এখন ১৫০ টাকা এবং যেখানে ১০০ টাকা দেওয়া হতো সেখানে এখন ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনিসুজ্জামানকে অনেকেই পরিবারের একজন সদস্যের মতো মনে করেন। সাধারণ ভোটারদের ভাষ্য, যেকোনো সমস্যা বা প্রয়োজনে তার কাছে গেলে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি শোনেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেন। এসব কারণে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে তাকে একজন শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, এলাকাবাসীর একাংশের ধারণা, বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে যোগ্য বিএনপি প্রার্থীর বিকল্প নেই। তবে দলগত সাফল্যের জন্য অবশ্যই একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপিকে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং একক প্রার্থীকে দলীয় সমর্থন দিতে হবে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী মোহাম্মদ আলীও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় রয়েছেন। তবে স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, ৫ আগস্টের আগে তিনি কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে এলাকায় তেমন পরিচিত ছিলেন না এবং বিগত আওয়ামী সরকারের আমলেও তাদের এলাকায় তেমন কোনো সামাজিক কর্মকাণ্ড বা জনগণের পাশে তাকে দেখা যায়নি।
এমতাবস্থায় ভোটারদের একাংশের মতে, ভোটাররা যদি জামায়াত প্রার্থীকে নির্বাচিত করেন, সে ক্ষেত্রে এলাকার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ হিসেবে এলাকাবাসী বলছেন, বর্তমান সরকার বিএনপি সরকার, তাই এই মুহূর্তে জামায়াতের কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত করা হলে তিনি শুধু সরকারের বিভিন্ন সমালোচনা করতে পারবেন, কিন্তু এলাকার আশানুরূপ উন্নয়ন করতে পারবেন বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সমর্থনের কারণে মোহাম্মদ আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং সাংগঠনিক উপস্থিতির ক্ষেত্রে তাকে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনী আলোচনায় আনিসুজ্জামান (জামান) তুলনামূলকভাবে বেশ এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা এবং মাঠে প্রচারণা শুরুর পর রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ডেমরা অঞ্চলের ৬৭ ও ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচনী হাওয়া দিন দিন গরম হচ্ছে। তৃণমূলের ত্যাগী নেতা হিসেবে এস এম রেজা চৌধুরী সেলিম ও মোঃ আনিসুজ্জামানের জনসম্পৃক্ততা তাদের রেসে এগিয়ে রাখলেও, জামায়াত প্রার্থীর উপস্থিতি ও আসন্ন তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোর একক প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত জয়-পরাজয়।






