ঘোড়াঘাটে বলগাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে ঘিরে তীব্র ক্ষোভ, পাঠদান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বলগাড়ী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে চরম স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি এবং অনৈতিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এই বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে গত রোববার (১৯ জুলাই) থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখায় সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বলগাড়ী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও বিদ্যালয়ের মূল্যবান সম্পদ বিনষ্টের অভিযোগে সরকারিভাবে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত পরিচালিত হয়। সেই সরকারি তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অধিকাংশ অভিযোগ দালিলিকভাবে প্রমাণিত হলেও, সম্প্রতি তাঁর অবসর ভাতা ও কল্যাণ তহবিলের বিপুল অর্থ ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট উচ্চতর দপ্তরে তোড়জোড় শুরু করেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি সাবেক প্রধান শিক্ষকের পক্ষে সুপারিশ ও অগ্রায়নপত্র পাঠালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং এর পর থেকেই সাধারণ শিক্ষক ও কর্মচারীদের মাঝে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে রোববার থেকে শিক্ষকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান কার্যক্রম থেকে পুরোপুরি বিরত রয়েছেন। এর ফলে সোমবারও কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এলেও শ্রেণিকক্ষে কোনো শিক্ষক না থাকায় চরম হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের মনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষকদের স্পষ্ট অভিযোগ, সাবেক প্রধান শিক্ষকের প্রমাণ হওয়া দুর্নীতির আকাশচুম্বী অনিয়মকে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সম্পূর্ণ আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বকেয়া টিউশন ফি শিক্ষকদের পরিশোধ না করা এবং বিদ্যালয়ের আবাদি জমি লিজের বিপুল অর্থ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষিত না থাকায় তাঁরা এই কঠোর আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের নথি সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট বিদ্যালয়ের সর্বস্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও নথিপত্র নষ্ট করার অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে একটি লিখিত আবেদন করেছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছিল, তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে শিক্ষকদের ন্যায্য টিউশন ফির অর্থ পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও কোনো ধরনের সরকারি টেন্ডার বা নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের ২৬৫টি মূল্যবান ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে বিক্রি করে আনুমানিক ২৬ লাখ টাকা পকেটে পুরেছেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘোড়াঘাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ের উদ্যোগে ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর ও একাডেমিক সুপারভাইজারকে নিয়ে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে দুর্নীতির সত্যতা মেলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তৎকালীন সময়ে সাধারণ শিক্ষকদের পক্ষে আন্দোলনের অন্যতম মূল নেতৃত্বদানকারী ও অভিযোগপত্রের স্বাক্ষরকারী ছিলেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম, যার বর্তমান রহস্যজনক অবস্থান পরিবর্তনে শিক্ষক মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এই উদ্ভূত পরিস্থিতির স্থায়ী প্রতিকার ও ন্যায়বিচার চেয়ে গত ৯ জুলাই ২০২৬ ইংরেজি তারিখে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মেজবাউল আলম সরকার বিদ্যালয়ের সভাপতি তথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সহ বিভিন্ন দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “সাবেক প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর বর্তমান ইউএনও আমাকে তাঁর পেনশনের কাগজপত্র যাতে আটকে না থাকে এবং বিদায় সংবর্ধনার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সভাপতি ইউএনওর স্বাক্ষরসহ প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাগজপত্র পাঠাতে আমি শুধু প্রশাসনিক সহযোগিতা করেছি। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেন বা দুর্নীতির প্রশ্নই আসে না।” অন্যদিকে, ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ রুবানা তানজিন জানান, “আমি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই সহকারী প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন তৎকালীন ইউএনও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠান। তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বলগাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের এই প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের রহস্যজনক ভূমিকা হিলির শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর একটি বড় কালো দাগ ফেলে দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষার্থে ও বলগাড়ী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের চলমান তীব্র সংকট দ্রুত নিরসন করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে জেলা শিক্ষা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয় সচেতন অভিভাবক মহল।






