রানার্সআপ আর্জেন্টিনাকে বীরের সম্মান, খেলোয়াড়দের ফেরার দিনে দেশজুড়ে জাতীয় ছুটি ঘোষণার ঘোষণা
ফুটবলের মহাযজ্ঞ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে অত্যন্ত লড়াকু ও শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে পরাজয়ের পরেও নিজেদের বীরদের সর্বোচ্চ মর্যাদায় বরণ করে নিতে প্রস্তুত লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের অসামান্য পারফরম্যান্স ও লড়াকু মানসিকতা উদযাপনের জন্য খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা যৌথভাবে যে দিনটি নির্ধারণ করবেন, ঠিক সেদিন দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাধারণ বা জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হবে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। গত রোববার ফুটবলের বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াইয়ে ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করলেও বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে নিজ দেশে বীরের সম্মানেই স্বাগত জানানো হবে।
পছন্দের দলের চিরন্তন ফুটবলীয় কুসংস্কারের কথা সরাসরি উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত মেগা ফাইনালে সশরীরে উপস্থিত না থাকা আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন, “বিশ্বকাপ উদযাপন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ঐতিহাসিক অর্জন ও আসরের দুর্দান্ত উদযাপন নিয়ে দেশবাসীর মনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে আমি পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই যে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা দেশে ফিরে উদযাপনের যে তারিখ ও দিনটি নির্ধারণ করবেন, সেই বিশেষ দিনটিকে দেশজুড়ে সম্মানার্থে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হবে।”
এদিকে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) তাদের সর্বশেষ সাংগঠনিক আপডেটে জানিয়েছে, রানার্সআপ হওয়া জাতীয় দলের প্রতিনিধিদলের একটি বড় অংশ সোমবার বিকেলের মধ্যেই রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে এসে পৌঁছাবে। তবে ক্লাবের ব্যস্ততা ও ব্যক্তিগত কারণে কয়েকজন তারকা খেলোয়াড় আপাতত নিজ দেশে ফিরছেন না। এএফএ’র পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, “ফাইনালের চরম উত্তেজনাকর ম্যাচের পর দলের কয়েকজন ফুটবলার যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে রওনা দেবেন, যাতে তারা নিজ নিজ ক্লাবে দ্রুত যোগ দিতে পারেন অথবা ছুটি কাটানো শুরু করতে পারেন। অন্যদিকে প্রধান প্রধান খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও অন্যান্য কর্মকর্তাসহ প্রতিনিধিদলের মূল অংশটি আগামীকাল সোমবার আর্জেন্টিনায় পদার্পণ করবে। তাদের বিকেল প্রায় ৫টার দিকে দেশের মাটিতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।”
ফুটবল ইতিহাসের পাতায় আর্জেন্টিনা ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে কিংবদন্তি পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিলের পর বিশ্বের প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য ও দুর্লভ লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সেই সোনালী স্বপ্ন পূরণ হলো না। ফাইনাল ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে স্পেনের বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেস বক্সের খুব কাছ থেকে এক জোরালো শটে আর্জেন্টিনার জাল কাঁপিয়ে টুর্নামেন্টের জয়সূচক গোলটি করেন। আর এর মাধ্যমেই ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবলের সর্বোচ্চ গৌরব ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা নিজেদের করে নেয়।
পুরো টুর্নামেন্টের এই জমকালো ও একপেশে ফাইনালে প্রায় পুরোটা সময়জুড়ে ছিল স্প্যানিশ আর্মাডাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। নির্ধারিত ৯০ মিনিট সময় শেষ হওয়ার আগে তারা আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে একাধিক নিশ্চিত গোলের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিল। অন্যদিকে ম্যাচের ৯৩তম মিনিটে আর্জেন্টিনার তারকা মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে চরম বিপর্যয়ে পড়ে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আলবিসেলেস্তেরা। পুরো ম্যাচে স্পেনের জমাট রক্ষণভাগের বিপরীতে আর্জেন্টিনার প্রথম লক্ষ্যে নেওয়া শটটি আসে ম্যাচের একেবারে শেষলগ্নে তথা ১১৭তম মিনিটে। দলের মহাতারকা লিওনেল মেসির ঐ দুর্দান্ত ও মরিয়া প্রচেষ্টা স্পেনের রক্ষণভাগ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিহত করে। ম্যাচ হারলেও প্রেসিডেন্ট মিলেই খেলোয়াড়দের লড়াকু মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে এক্সে লিখেছেন, ‘‘অসংখ্য ধন্যবাদ, খেলোয়াড়…!!! শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমরা বীরের মতো লড়েছ। আর্জেন্টিনা সব সময় বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে থাকবে।”
টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছে গিয়েও স্পেনের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হলেও বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার এই রানার্সআপ ট্রফি অর্জনকে খাটো করে দেখছেন না দেশটির সমর্থক ও সরকার। এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড ও মেসির শেষ মুহূর্তের ব্যর্থতার পরেও বুয়েন্স আয়ার্সে ডিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরিদের রাজকীয় অভ্যর্থনা ও জাতীয় ছুটির ঘোষণা বিশ্ব ফুটবলে আলবিসেলেস্তেদের আবেগ ও জনপ্রিয়তারই বহিঃপ্রকাশ।









