নেপাল-তিব্বতে হিমবাহ ধসে প্রলয়ংকারী বন্যা: নিহতের সংখ্যা ৩৯২ নিখোঁজ ১৪ শতাধিক
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার পর কাদার স্তূপ ও ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে এক প্রলয়ংকারী হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। বরফশীতল পানি ও কাদার তীব্র স্রোতে একাধিক গ্রাম পুরোপুরি ভেসে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের। কাদার তোড়ে বাড়িঘর ও বাঁধ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি বহু যানবাহন খেলনার মতো ভেসে গেছে। এ দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে অন্তত ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের অনুসন্ধানে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই দিনরাত উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ গলে ধসে পড়ার কারণেই এই প্রলয়ংকরী ঘটনার সৃষ্টি হয়। সংস্থাটি প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করলেও পরবর্তীতে ভূ-কম্পন তথ্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করে যে, এটি ছিল বিশাল একটি হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এই ধরণের বিপর্যয়ের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পরিবেশ-ইতিহাসবিদ ও অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুথ গ্যাম্বল এ দুর্যোগকে ‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা নেপালের ভেতরে অন্তত ১৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত তাণ্ডব চালিয়েছে।
সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারী দলগুলোর পাশাপাশি নেপালের সেনারা প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছেন। সীমান্তবর্তী তিমুরে এলাকার ৩৫ বছর বয়সী কাস্টমস কর্মকর্তা ওমকার যোশি এলাকাটিকে একটি ‘বিশাল কবরস্থান’ হিসেবে বর্ণনা করে জানান, চারদিকে শুধু বালি আর নুড়িপাথর মানুষের রক্তে লাল হয়ে আছে। নেপাল পুলিশ এখন পর্যন্ত ৩৮৯টি মরদেহ উদ্ধার করার তথ্য নিশ্চিত করেছে এবং সেখানে ৯১০ জনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, যার মধ্যে ৫১৭ জনই বিদেশি পর্যটক। এর বাইরে চীন জানিয়েছে, নেপালে থাকা তাদের ১০০ জন নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ বিদেশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন নাগরিকের সঙ্গেও সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তিব্বত অংশের গিরং বন্দরে ভূমিধসে তিনজন নিহত এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত থেকে তীর্থযাত্রা শেষে ফেরার পথে বিপুল সংখ্যক হিন্দু তীর্থযাত্রী বন্যায় আটকা পড়ে নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আধ্যাত্মিক নেতা সদগুরু। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ঘটনাস্থল ও দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পুনর্বাসন এবং সড়ক সচল করার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে, তিব্বতে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ৮০০ জরুরি উদ্ধারকর্মী ও স্পিডবোট মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে নদীর উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষ আটকে থাকায় কৃত্রিম জলাধার তৈরি হয়েছে, যা থেকে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের বন্যা দেখা দেওয়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে। কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘আইসিআইএমওডি’-এর জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং এবং নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা দালাই লামা শোক প্রকাশ করে প্রার্থনা করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে যে ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই আকস্মিক দুর্যোগ তারই এক করুণ প্রমাণ। নিখোঁজ সহস্রাধিক মানুষের জীবিত উদ্ধার এবং দ্বিতীয় দফার বন্যার হাত থেকে দুর্গত এলাকাগুলোকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।









