Views: 11
বান্দরবানের লামা উপজেলায় বনবিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী কাঠ পাচারকারী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে অবাধে চলছে অবৈধ কাঠ পাচারের মহোৎসব। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির শিথিলতাকে পুঁজি করে পাচারকারীরা এখন নতুন কৌশলে ঝিরি ও খালপথ ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সেগুন ও গামারী কাঠ পাচার করছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, লামা সদর ইউনিয়নের পৌপা মৌজা এবং রুপসীপাড়া ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংমুখ এলাকা ও ডলুছড়ি খালের উজানসহ বিভিন্ন দুর্গম ঝিরি পথ ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘ দিন ধরে এই অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভের সাথে জানান, প্রতিদিন বিকেল ৫টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই কাঠ পাচারের কর্মকাণ্ড। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি গাড়িতে করে অবৈধ কাঠ ও জ্বালানি লাকড়ি বিভিন্ন ইটভাটা ও স্থানীয় বাজারে পাচার করা হয়। বনখেকোদের এমন তাণ্ডবে লামার পৌপা হেডম্যান পাড়া, গিলা পাড়া, খ্রিস্টান পাড়া এবং কাইরম পাড়াসহ রুপসীপাড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বনজ সম্পদ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। গত কয়েক বছরে এই সিন্ডিকেট অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি বাগানের মূল্যবান গাছ কেটে সাবাড় করেছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। এর ফলে একদিকে যেমন পাহাড় ন্যাড়া হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বিলুপ্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
গোপন সূত্রে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তারা জানান, বাগান থেকে কাঠ কাটা এবং তা পরিবহন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করা হয়। মূলত এই ‘ম্যানেজ প্রথা’র কারণেই কাঠ পাচারের ট্রাকগুলো খুব সহজেই সব চেকপোস্ট পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। রাষ্ট্রের বনসম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যাস্ত, তাদের এমন পরোক্ষ সহযোগিতায় বন ও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে নির্বিচারে বন উজাড় চলতে থাকলে পাহাড়ি এলাকায় মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পাবে এবং অচিরেই পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উল্লেখ্য যে, ১৯২৭ সালের বন আইন (বাংলাদেশ সংশোধিত) অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা, অপসারণ বা পরিবহন করা গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের আওতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা, বড় অংকের অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও লামার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। বৈধ পারমিট ও ট্রানজিট পাস ছাড়া কাঠ পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও পাচারকারীরা ক্ষমতার দাপটে এসব নিয়মের তোয়াক্কা করছে না। সচেতন মহলের দাবি, বন উজাড় বন্ধ করতে হলে কেবল মাঠ পর্যায়ের শ্রমিক নয়, বরং পাচারকারী সিন্ডিকেটের মূল হোতা এবং তাদের মদদদাতা কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
লামার বনসম্পদ রক্ষা এখন সময়ের দাবি। নিয়মিত বন টহল জোরদার এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই এই জনপদ মরুভূমিতে পরিণত হবে। পাহাড়ের পরিবেশ ও সরকারি রাজস্ব রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছে এলাকাবাসী।