মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ন

গাজীপুরে রাতের রাজা মাটিখেকো সিন্ডিকেট: বিপন্ন হচ্ছে আবাদি জমি
মোঃ সোহেল মিয়া: / ১ বার দেখা হয়েছে
আপডেট মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
গাজীপুরের ইসলামপুর ও কারখানা বাজার এলাকায় রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে মাটি কাটার দৃশ্য।
গাজীপুরের ইসলামপুর ও কারখানা বাজার এলাকায় রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে মাটি কাটার দৃশ্য। ছবি: প্রতিকি

Views: 0

গাজীপুরে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে রাতের আঁধারে চলছে ভেকু দিয়ে মাটি কাটার মহোৎসব। রাত যত গভীর হয়, মাটিখেকোদের দৌরাত্ম্য ততই বেড়ে যায়। সরেজমিনে গাজীপুর মহানগরের ১৪ নং ওয়ার্ড বাসন থানাধীন ইসলামপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিনটি ড্রাম ট্রাকে করে বিরতিহীনভাবে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ট্রাকচালকের কাছে মাটির উৎস জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে জানান, তারা সরকারি জমি থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ড্রাম ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছেন। এই সিন্ডিকেটে কারা জড়িত এমন প্রশ্নে চালক দম্ভের সাথে বলেন, এলাকার অনেক বড় বড় নেতা এবং কর্মীরা এর সাথে যুক্ত। এমনকি সাংবাদিকদের তুচ্ছজ্ঞান করে তিনি বলেন, অনেক সাংবাদিক এসে খরচ নিয়ে চলে যায়, আমরা প্রশাসন ম্যানেজ করেই এই ব্যবসা করি। পরবর্তীতে লিটন নামে এক ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্যের পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে মুখ বন্ধ করার প্রস্তাব দেন।

একই চিত্র দেখা গেছে সদর থানাধীন কারখানা বাজার এলাকায়। সেখানে রীতিমতো তিনটি ভেকু মেশিন এবং ১০টি ড্রাম ট্রাক দিয়ে চলছে মাটি কাটার মহাউৎসব। শতাধিক লোক এলাকাটি পাহারা দিচ্ছে যাতে কেউ ছবি বা ভিডিও করতে না পারে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা বাধা প্রদান করে এবং বিল্লাল নামে এক ব্যক্তির সাথে কথা বলতে বলে। তবে সেখানে কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এক পর্যায়ে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হলে তারা ৩৩৩-এ কল করতে বলে, কিন্তু রাতের বেলা এই নাম্বারে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এই সুযোগে প্রভাবশালী চক্রটি কৃষি জমি খুঁড়ে গভীর গর্ত করে মাটি লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না। বাধা দিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। আমাদের আবাদি জমিগুলো এখন ডোবায় পরিণত হচ্ছে, অথচ প্রশাসন সব জেনেও নীরব ভূমিকা পালন করছে।

আইন অনুযায়ী, ‘বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০’ মোতাবেক কৃষিজমি থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কোনো আবাদি জমি বা সরকারি জমি থেকে মাটি কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। এর ফলে জমির উপরিভাগের উর্বর অংশ (Top Soil) চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির উপরিভাগ কেটে নিলে সেই জমিতে আগামী ১০-১৫ বছরেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া গভীর গর্তের কারণে পাশের জমিগুলো ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। গ্রামীণ রাস্তাঘাটগুলো ভারী ড্রাম ট্রাক চলাচলের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।

গাজীপুরবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে এই মাটিখেকো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কৃষি জমি এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের নীরবতা ভাঙবে এবং দোষীরা আইনের আওতায় আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী জনগণের। অন্যথায় শিল্পনগরী গাজীপুর তার উর্বর কৃষিজমি হারিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

গাজীপুরের এই ক্রাইম সিন্ডিকেট রুখতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষি জমি ধ্বংসের এই মহাউৎসব বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে এই অবৈধ মাটি কাটার হিড়িক থামাতে।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও
Popular Post
Last Update
PhotoCard Icon
Create PhotoCard