প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একাই লড়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই অভিনেত্রী

চিত্রনায়িকা ববিতা এবং তাঁর একমাত্র ছেলে অনিক ইসলামের বিরল ছবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলার চলচ্চিত্রের কালজয়ী অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা। রুপালি পর্দার ঝলমলে আলোর আড়ালে এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর জীবন ছিল সীমাহীন ত্যাগ ও সংগ্রামের মহাকাব্যে ঘেরা। আজ বিশ্ব মা দিবসে নিজের সেই সংগ্রামী জীবনের অজানা অধ্যায়গুলো শেয়ার করেছেন তিনি। ১৯৮২ সালে ব্যবসায়ী ইফতেখারুল আলমকে বিয়ে করেছিলেন ববিতা। মাত্র ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনের মাথায় ১৯৯৩ সালে স্বামীহারা হন তিনি। এরপর সামনে ছিল দুটি পথ—হয় নতুন করে জীবন শুরু করা, না হয় একা হাতে একমাত্র সন্তান অনিক ইসলামকে মানুষ করা। ববিতা বেছে নিয়েছিলেন কঠিন পথটি। সন্তানের সুখ ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি এই ‘অশনি সংকেত’ খ্যাত তারকা।

স্বামীর মৃত্যুর পর ববিতার চারদিকে যেন ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছিল। অনিকের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। একদিকে আকাশচুম্বী ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা, অন্যদিকে কোলের শিশুকে আগলে রাখার লড়াই। ববিতা জানান, স্বামী ইফতেখারুল আলম তাঁকে সিনেমার বিষয়ে সবসময় পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর অকাল প্রয়াণে ববিতাকে একাই শুটিং, আয়-রোজগার এবং সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়। আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের পক্ষ থেকে পুনরায় বিয়ের জন্য প্রচুর চাপ থাকলেও ববিতা ছিলেন অনড়। তাঁর ভয় ছিল, নতুন কেউ সংসারে এলে হয়তো ছোট্ট অনিকের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন না বা অনিক তাঁর প্রাপ্য ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে।

শুটিংয়ের ব্যস্ততার মাঝে সন্তানকে চোখে চোখে রাখার জন্য ববিতা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। ‘লেডি স্মাগলার’ ছবির শুটিং করতে ফিলিপাইনে গিয়ে তিনি অ্যানি সি স্কোভা নামের এক তরুণীকে পছন্দ করেন। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেই ফিলিপিনো তরুণীকে দেশে নিয়ে আসেন অনিকের দেখাশোনার জন্য। অ্যানি প্রায় ১০-১২ বছর ববিতার সংসারে ছায়ার মতো ছিলেন। ববিতা আবেগাপ্লুত হয়ে স্মৃতিচারণ করেন, অনিক যখন ছোট ছিল, তখন শুটিংয়ে যাওয়ার সময় ও খুব কাঁদত। কিন্তু পেশাদারিত্বের দায়বদ্ধতা আর সংসারের খরচ চালানোর তাগিদে চোখের জল মুছে ববিতাকে স্টুডিওতে যেতে হতো। আউটডোর শুটিং প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন যাতে দিনশেষে ছেলের কাছে ফিরতে পারেন।

ববিতার সেই ত্যাগের ফল আজ সোনায় সোহাগা। মা ববিতার যোগ্য সন্তান হিসেবে অনিক ইসলাম কানাডার ওয়াটার লু ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে এখন প্রতিষ্ঠিত। ববিতা মনে করেন, একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে তাঁর পথচলা অনেক কঠিন হলেও অর্জিত শান্তি অতুলনীয়। অনিক বড় হওয়ার পর একবার মাকে বলেছিলেন একজন সঙ্গী খুঁজে নিতে, কিন্তু ববিতা মুচকি হেসে জানিয়েছিলেন, “বাবা, তুমি আছো তো, আমার আর কাউকে লাগবে না।” সত্যজিৎ রায়ের বিশ্বজয়ী সিনেমা থেকে শুরু করে ২৭৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই গুণী অভিনেত্রী আজ গর্বিত এক মা হিসেবে জীবন অতিবাহিত করছেন।

ফরিদা আক্তার ববিতা কেবল একজন সফল অভিনেত্রীই নন, বরং প্রতিটি সিঙ্গেল মাদারের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ‘সুপারহিট’ চিত্রনাট্য।

Web: www.banglanewstv.net G-mail: banglanewstv17@gmail.com

প্রিন্ট করুন