পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের মাঝে প্রতিবছরই ফিরে আসে ত্যাগের মহিমান্বিত এক স্বর্গীয় বার্তা নিয়ে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় পশুকে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে মোমিন বান্দা মূলত তার ভেতরের অহংকার, লোকদেখানো মানসিকতা ও পঙ্কিলতাকে কুরবানি করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে আমাদের এই মহান ইবাদতের বাহ্যিক জৌলুস যতটাই বাড়ছে, এর অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ও সামাজিক চেতনা ঠিক ততটাই যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। পশুর দামের প্রতিযোগিতা আর সামাজিক মর্যাদার লড়াইয়ে লিপ্ত হতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি কুরবানির মূল দাবি। যখন একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তি দামি পশু কুরবানি করে তার সিংহভাগ গোশত নিজের ফ্রিজের গভীর প্রকোষ্ঠে জমিয়ে রাখেন, অথচ তার ঘরের ঠিক পাশেই একজন অভাবী প্রতিবেশী কিংবা দরিদ্র খামারি গোশতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকেন, তখন সেই কুরবানির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় রকমের নৈতিক ও ধর্মীয় প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া স্বাভাবিক।
ইসলামের সুমহান বিধান অনুযায়ী, কুরবানির পশুর গোশতকে সাধারণত তিন ভাগে বণ্টন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে—এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং অবশিষ্ট এক ভাগ সমাজ ও পাড়া-প্রতিবেশীর দরিদ্র মানুষের জন্য। এটি কেবল একটি নিয়মের ফ্রেমওয়ার্ক নয়, বরং এটি হলো সাম্য ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের এক অনন্য কৌশল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে এখন এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে গোশত জমিয়ে রাখার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কোরবানির ঈদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কার ফ্রিজে কত কেজি গোশত সংরক্ষণ করা হলো, সেই হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকে। অন্যদিকে, সারা বছর ধরে যে পরিবারটি একটু পুষ্টিকর খাবারের আশায় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে, ঈদের দিনেও তাদের কপালে হয়তো জোটে না এক টুকরো মানসম্মত গোশত। এই দৃশ্যটি আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক অবক্ষয়ের এক চরম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কুরবানির পশুর রক্ত কিংবা মাংস তাঁর দরবারে পৌঁছায় না, বরং যা পৌঁছায় তা হলো বান্দার অন্তরের তাকওয়া বা খোদাভীতি। তাকওয়ার মূল কথাই হলো আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়াশীল হওয়া এবং নিজের স্বার্থকে বিলিয়ে দিয়ে অন্যকে সুখী করা। ফ্রিজ ভরে রাখা যদি আমাদের কুরবানির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা কেবলই একটি উৎসবকেন্দ্রিক পশুজবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজের রসনাবিলাসের জন্য কোটি টাকা খরচ করে পশু কিনে, সেই পশুর গোশত যদি সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারে, তবে সেই রক্তক্ষরণের কোনো আত্মিক মূল্য থাকে না। প্রতিবেশী অভুক্ত থাকা অবস্থায় নিজের উদরপূর্তি করাকে ইসলাম কখনো সমর্থন করে না।
আজ আমাদের আত্মসমীক্ষা করার সময় এসেছে। ঈদুল আজহা আমাদের যে সামাজিক মেলবন্ধনের শিক্ষা দেয়, তা আজ যান্ত্রিক সভ্যতার যাতাকলে পিষ্ট। করপোরেট সংস্কৃতির যুগে ফ্রিজের ধারণক্ষমতা দিয়ে যখন আমাদের কুরবানির পরিধি মাপা হয়, তখন মানবিকতা কেঁদে ওঠে। আমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই একটি ইনসাফভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এই ঈদে আসুন আমরা আমাদের ফ্রিজের দরজাগুলো একটু কম খুলি এবং আমাদের হৃদয়ের দরজাগুলো আরও বেশি উন্মুক্ত করি। আমাদের চারপাশের ক্ষুধার্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে উপলব্ধি করি এবং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে সবার মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দিই। তবেই আমাদের কুরবানি হবে পারফেক্ট, তবেই পূর্ণতা পাবে আমাদের মোনাজাত।
কুরবানির সার্থকতা কেবল পশু জবাইয়ের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি নির্ভর করে ত্যাগের গভীরতার ওপর। প্রতিবেশী দরিদ্র বলে গোশত পাবে না, আর খামারিরা বঞ্চিত থাকবে—এমন সমাজ কোনো কল্যাণকামী সমাজ হতে পারে না। আসুন, লোকদেখানো সংস্কৃতির বলয় থেকে বের হয়ে এসে গোশত বণ্টনে সততা ও ইনসাফ কায়েম করি, যাতে সমাজের প্রতিটি মানুষের ঈদ আনন্দপূর্ণ হয়।

বিশেষ উপ-সম্পাদকীয়