প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

চট্টগ্রামে লোকনাথ মন্দির দখল নিয়ে ইসকন ও সাধারণ হিন্দুদের সংঘর্ষ, কক্ষ ভাঙচুর

চট্টগ্রাম মহানগরীর নন্দনকানন এলাকার লোকনাথ মন্দির এবং সেখানে সংঘর্ষের পর মোতায়েনকৃত চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)-এর বিশেষ আভিযানিক দল
শাহীন আকতার, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম মহানগরীর কেন্দ্রস্থল নন্দনকানন এলাকায় একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির এবং তার সংলগ্ন মূল্যবান জমির নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা নেওয়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর অনুসারীদের সঙ্গে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ৬ জুন শনিবার ভোরে সংঘটিত এই দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনার খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ন্যাক্কারজনক এই সহিংসতার সাথে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে একজনকে আটক করতে সক্ষম হয়।

পুলিশ প্রশাসন, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, গতকাল ভোররাতের দিকে ইসকনের একটি সঙ্ঘবদ্ধ দল নন্দনকানন এলাকার লোকনাথ মন্দির-সংলগ্ন পবিত্র স্থানে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালায়। ইসকন অনুসারীদের এই আকস্মিক অনুপ্রবেশের চেষ্টা স্থানীয় সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের নজরে আসলে তারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের পথরোধ করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও চরম উত্তেজনা শুরু হয়। একপর্যায়ে সেই সাধারণ তর্কাতর্কি মারাত্মক রূপ ধারণ করে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষের সময় উত্তেজিত হামলাকারীরা ওই লোকনাথ মন্দির এলাকার একটি কক্ষ ব্যাপক ভাঙচুর করে এবং মন্দিরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভোররাতের এই চাঞ্চল্যকর সংঘাতের বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, নন্দনকাননের লোকনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে মূলত ইসকন এবং স্থানীয় সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভ্যন্তরীণ ও গভীর বিরোধ চলে আসছিল। সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিরোধের জের ধরেই মূলত গতকাল ভোররাতে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। ঘটনার বার্তা পাওয়া মাত্রই বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিচার্জ ও কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রশাসনের সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, লোকনাথ মন্দিরসংলগ্ন কিছু সরকারি খাসজমি অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা নিয়ে ইসকন অনুসারীদের সাথে তাদের দীর্ঘদিন ধরে চরম বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমা চলে আসছে। স্থানীয় সনাতনীদের দাবি, বিতর্কিত ধর্মীয় সংগঠন ইসকন ধাপে ধাপে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে ওই সরকারি খাসজমি এবং মূল লোকনাথ মন্দিরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য এই অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে স্থানীয়দের এমন গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে ইসকনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো নেতার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্ট সুধী সমাজ গভীর উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, অতীতেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইসকনের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক জমি দখল এবং বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরের নাম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল পরিমাণ অনুদান সংগ্রহের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রবর্তক সংঘের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও ইসকনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ন্যাক্কারজনক আর্থিক অনিয়ম, চুক্তিভঙ্গ ও জমি দখলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। গতকালকের এই সংঘর্ষের ঘটনায় আহত চারজনকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের হাতে আটককৃত ব্যক্তির পরিচয় ও এই সহিংসতায় তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে গড়মুর ও কোতোয়ালী থানা পুলিশের তদন্ত চলমান রয়েছে। ঘটনার পর থেকে পুরো নন্দনকানন ও আশপাশের এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুরো অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখতে ও পুনরায় সংঘাত এড়াতে মন্দির এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা টহল জোরদার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, উভয় পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে ঘটনার সঠিক তদন্ত করা হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ধর্মীয় উপাসনালয় বা খাসজমি দখলকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত কোনোভাবেই কাম্য নয়। চট্টগ্রামের নন্দনকাননে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সিএমপি পুলিশকে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং ইসকনের বিরুদ্ধে ওঠা জমি দখলের দীর্ঘদিনের অভিযোগের একটি স্থায়ী আইনি সমাধান দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।

Web: www.banglanewstv.net G-mail: banglanewstv17@gmail.com

প্রিন্ট করুন