প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩

আশুলিয়ায় ইউপি সচিব আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়

আশুলিয়ায় ইউপি সচিব আবুল কালাম আজাদ
মোঃ আসিফ আহমেদ, আশুলিয়া

ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া এলাকার ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের দাবি, স্বল্প বেতনের একজন সরকারি কর্মচারী হয়েও তিনি নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে গোটা এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে এবং সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সেবা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই এই ইউপি সচিবের বিরুদ্ধে অনিয়মের পাহাড় জমেছে। নাগরিক সনদ প্রদান, বিভিন্ন সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাতা কার্যক্রম এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সেবায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই। বিশেষ করে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশ বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা দ্রুত অনুমোদনের আশ্বাস দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কথাও অভিযোগকারীরা সরাসরি জানিয়েছেন।

এছাড়া জন্ম ও মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াতেও ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারিভাবে নির্ধারিত ফির তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ অবৈধভাবে আদায় করা হয় এবং এই নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত রফাদফার টাকা না দিলে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা হয়। এতে সাধারণ নিরীহ মানুষকে দিনের পর দিন চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে তারা মারাত্মক অভিযোগ করেছেন। স্থানীয়রা আরও জানান, এর আগে তেঁতুলজোড়া ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকালেও প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তিনি একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে ধামসোনা ইউনিয়নে যোগদানের পরও সেই পূর্বের ন্যায় প্রভাব বজায় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক অসহায় ভুক্তভোগী তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে সাহস পান না বলেও স্থানীয়দের দাবি।

অন্যদিকে তাঁর অর্জিত বিপুল সম্পদ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে নানা কৌতূহল ও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য ও দাবি অনুযায়ী, আশুলিয়ার কাটগড়া বাংলালিংক সড়ক এলাকায় এই ইউপি সচিবের একটি বহুতল ভবন ও সুবিশাল মার্কেট রয়েছে। এছাড়া সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন প্রাইম লোকেশনে তাঁর নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি, প্লট এবং বিলাসবহুল বাড়ি থাকার কথাও জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। একজন ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের মাসিক সরকারি মূল বেতন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ায় এই সীমিত আয়ের সঙ্গে তাঁর দৃশ্যমান বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবনে সর্বক্ষণিক নিরাপত্তাকর্মীও নিয়োজিত রয়েছে, যার মাসিক বেতনও অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তবে এই বিপুল সম্পদের বৈধ উৎস সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা আইনগত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পদ যদি তাঁর জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে বিষয়টি দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনা করা সম্ভব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত সকল সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার সুনির্দিষ্ট আইনি বিধানও রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মচারী চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা ও বরখাস্তের নিয়ম রয়েছে। এলাকার সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীরা এই পুরো বিষয়টি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, যাতে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত হয়।

ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের সবচেয়ে নিকটবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি সেবার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের প্রত্যাশা জড়িত থাকে। তাই ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

Web: www.banglanewstv.net G-mail: banglanewstv17@gmail.com

প্রিন্ট করুন