ফুটবল বিধাতা বোধহয় আর্জেন্টিনার ভাগ্যে চরম উত্তেজনার কথাই লিখে রেখেছেন। গোল হজম, পেনাল্টি মিস, একের পর এক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া আর ম্যাচের ৬৭ মিনিটে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া; সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ বা নকআউট পর্ব থেকেই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় তখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল। কিন্তু আলবিসেলেস্তেরা যে সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয়, তা আরও একবার বিশ্বমঞ্চে প্রমাণিত হলো। মৃত্যুকূপের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে এসে মাত্র ১৩ মিনিটের এক বিধ্বংসী টর্নেডো ঝড়ে মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের এক নতুন গল্প লিখল আর্জেন্টিনা। শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় মিশরকে ৩-২ গোলে স্তব্ধ করে দিয়ে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখল তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথম প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকে মাঠ ছাড়তে হয় আর্জেন্টিনাকে। ম্যাচের ১৫ মিনিটে কর্নার থেকে মারওয়ান আতিয়ার মাপা ক্রসে ডি-বক্সের মাঝখান থেকে দুর্দান্ত এক হেডে মিশরের ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম বল জালে জড়ালে ১-০ তে পিছিয়ে পড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ধাক্কা সামলে ২১ মিনিটেই সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায় লিওনেল স্কালোনির দল। মিশরের বক্সে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু অধিনায়ক লিওনেল মেসির নেওয়া দুর্বল গতির বাঁ পায়ের শটটি ডানদিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। এই মিসের পর বিশ্বকাপে নেওয়া ৮টি পেনাল্টীর ৪টিই হাতছাড়া করার এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড গড়েন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। চলতি আসরে এটি তাঁর দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। অন্যদিকে ইরানের মেহদি তারেমির পর মেসির পেনাল্টি আটকে দিয়ে টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় সেভের দেখা পান মোস্তফা। এরপর ২৮ মিনিটে রদ্রিগো দে পলের ক্রসে মাক আলিস্তারের হেড এবং ৩৯ মিনিটে তাগলিয়াফিকোর কাটব্যাক থেকে হুলিয়ান আলভারেজের জোরালো শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিরিয়ে দিয়ে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন মোস্তফা শোবেইর।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মিশরের ৯ জন খেলোয়াড় রক্ষণভাগে শক্ত দেয়াল তুলে দাঁড়ালে মেসি কিছুটা জায়গা তৈরি করে দে পলকে বল বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া দে পলের নিচু শটটি সহজেই গ্লাভসবন্দী করেন মোস্তফা। উল্টো ৫৮ মিনিটে মোহাম্মদ সালাহর পাস আর হাসানের চমৎকার দৌড় থেকে আসা জিকোর এক চোখধাঁধানো কাউন্টার অ্যাটাক ফিনিশিংয়ে উল্লাসে মেতেছিল মিশর। তবে আক্রমণের শুরুতে ফাউল থাকায় ভিএআরের (VAR) সাহায্যে গোলটি বাতিল করে আর্জেন্টিনাকে ফ্রি-কিক দেন রেফারি। কিন্তু গোল বাতিলের সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকেনি। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে আর কোনো ভুল করেনি ফারাওরা। পাল্টা আক্রমণ থেকে হাসানের বাড়ানো নিখুঁত পাস ধরে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে আবারও বল জালে জড়ান জিকো। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে তখন খাদের কিনারায় ছিটকে যায় আর্জেন্টিনা।
দুই গোল হজম করার পর যেন খ্যাপাটে বাঘের মতো জেগে ওঠে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর মহাকাব্য শুরু হয়। রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়া ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ডান দিক থেকে বাড়ানো মেসির চমৎকার ক্রসে এক দুর্দান্ত হেডে ব্যবধান ২-১ করেন। মিশরীয় গোলরক্ষক হাত ছোঁয়ালেও বলের গতি রোধ করতে পারেননি। মিশর ডিফেন্ডাররা অফসাইডের দাবি তুললেও রেফারি তা নাকচ করে দেন। ঠিক ৪ মিনিট পর, ম্যাচের ৮৪ মিনিটে পুরো স্টেডিয়ামকে উল্লাসে মাতান মহাতারকা লিওনেল মেসি। জোরালো এক শটে গোলরক্ষকের গায়ে লেগে বল বারের নিচের অংশ ছুঁয়ে জালে জড়ালে ২-২ সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। চলতি বিশ্বকাপে এটি মেসির ৮ম গোল এবং এর মাধ্যমে টানা নয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অতিমানবীয় কৃতিত্ব অর্জন করলেন এলএমটেন।
তবে নাটকের শেষ অঙ্ক তখনো বাকি ছিল। ম্যাচের যোগ করা সময়ে অর্থাৎ ৯২ মিনিটে আর্জেন্টিনার এক গতিময় পাল্টা আক্রমণ থেকে বক্সের মাঝখানে বল পান এনজো ফার্নান্দেজ। বদলি হিসেবে মাঠে নামা লাউতারো মার্তিনেজের নিখুঁত অ্যাসিস্টে চমৎকার এক হেডে মিশরের জাল কাঁপিয়ে দলকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন এনজো ফার্নান্দেজ। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ৩টি গোল হজম করে ততক্ষণে ম্যাচ থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে গেছে মিশর। শেষ পর্যন্ত এই অবিশ্বাস্য ও অবিস্মরণীয় জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই জয়টি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও মেসি ও এনজোদের লড়াকু মানসিকতা প্রমাণ করে কেন তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এই রোমাঞ্চকর জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনালে আলবিসেলেস্তেদের আত্মবিশ্বাস আরও বহুগুণ বেড়ে গেল।

ক্রীড়া প্রতিবেদক, বাংলা নিউজ টিভি