কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু অপহরণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে মুক্তিপণ দাবির নৃশংস ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্রের কথিত মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উখিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে আটক করা সম্ভব হয়। বুধবার কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই সাফল্য ও বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২২ জুলাই উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১১ এলাকা থেকে মাত্র পাঁচ বছর বয়সী অবোধ শিশু রহমত আলীকে অপহরণ করে একদল সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। অপহরণের পর দুষ্কৃতকারীরা শিশুটিকে অজ্ঞাত স্থানে জিম্মি করে রাখে এবং তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে একটি নির্মম ভিডিও চিত্র ধারণ করে। পরবর্তীতে সেই ভয়াবহ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ ও ছড়িয়ে দিয়ে শিশুটির স্বজনদের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। চরম ভীত ও শংকিত পরিবারটি অবোধ শিশুটির জীবন বাঁচানোর আকুলতায় প্রথম দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কিছু না জানিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে তাকে উদ্ধারের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছিল।
জেলা পুলিশ আরও জানায়, ইন্টারনেটে নির্মম ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ঘটনাটি কক্সবাজার জেলা পুলিশের সুদৃঢ় নজরে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশের একাধিক দক্ষ দল অবিলম্বে উদ্ধার অভিযানে নামে। পুলিশি অভিযানের সুনির্দিষ্ট খবর টের পেয়ে অপহরণকারীরা তড়িঘড়ি করে সটকে পড়ার চেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে নিখুঁত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং ধারাবাহিক নজরদারির ভিত্তিতে উখিয়ার সীমান্তঘেঁষা এলাকা থেকে বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে বহুল আলোচিত এই চক্রের কথিত মূলহোতা মো. জাকারিয়া ওরফে জকরিয়াকে (৩৭) গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আটককৃত জাকারিয়াকে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে শিশু রহমত আলীকে অপহরণের সরাসরি জড়িত থাকার কথা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে স্বীকার করেছে। জাকারিয়ার দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সে ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে কুতুপালং ও আশেপাশের সীমান্ত এলাকায় কোমলমতি শিশুসহ অন্যান্য সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে অপহরণ করত। পরবর্তীতে নির্জন স্থানে জিম্মি রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মুক্তিপণ আদায়সহ নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সিন্ডিকেট আকারে পরিচালনা করে আসছিল।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই দুর্ধর্ষ অপহরণচক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সক্রিয় সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বর্তমানে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। পুলিশের তৎপরতায় উদ্ধার পাওয়া শিশু রহমত আলী বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় নিজ পরিবারের হেফাজতে রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত মূলহোতা জাকারিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চলছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও তৎসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় দুর্ধর্ষ অপহরণচক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও সফল হস্তক্ষেপ যেমন একটি অবোধ শিশুর জীবন রক্ষা করেছে, তেমনই অপরাধীদের দমনে পুলিশের এই জিরো টলারেন্স নীতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।

মোঃ হারুন অর রশিদ, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি