প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

গাছায় ২ শিক্ষার্থীকে উ/ল/ঙ্গ করে পৈশাচিক নির্যাতন: উত্তপ্ত খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়ায় শিক্ষক আটক

মোঃ সোহেল মিয়া, নিজস্ব প্রতিবেদক:

গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানাধীন পশ্চিম ঝাঝড় এলাকার “দারুত তাকওয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা”য় দুই কোমলমতি শিক্ষার্থীকে উলঙ্গ করে হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারধর এবং আগুনে উত্তপ্ত লোহার খুন্তি দিয়ে শরীরের সংবেদনশীল স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়ার পৈশাচিক অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা মূল অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে।

​গ্রেফতারকৃত শিক্ষকের নাম মাওলানা মো. সোয়াইব (২৪)। তিনি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া এলাকার বাসিন্দা এবং ওই মাদ্রাসার পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ঘটনায় থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগে আরও দুই সহকারী শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত অপরাপর শিক্ষকদ্বয় হলেন— মো. হাবিবুর রহমান (২৬) ও মো. শাহিন (১৯)।

​থানায় দায়ের করা অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর পৃথক দুটি দফায় চরম বর্বরতা চালানো হয়। প্রথম ঘটনায় ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী বায়েজীদের বাবা মো. নাজমুল মিয়ার অভিযোগ, ওই দিন বিকেলে খেলায় অন্য এক ছাত্রের পায়জামা খুলে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিবাদ বিচার করতে গিয়ে শিক্ষক সোয়াইব চরম হিংস্র হয়ে ওঠেন। বায়েজীদকে উলঙ্গ করে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে নীলাফোলা জখম করা হয় এবং পরবর্তীতে আগুনে উত্তপ্ত লোহার খুন্তি দিয়ে তার নিতম্বে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। শারীরিক ও মানসিক ক্ষত ঢাকতে ভীতিপ্রদর্শন করায় পরিবারকে প্রথমে ‘ফোড়া’ হয়েছে বলে মিথ্যা জানায় ভয়ে তটস্থ বায়েজীদ। পরে ১০ সেপ্টেম্বর রাতে শরীরে মলম লাগাতে গেলে তার পোড়া ও পিটুনির ক্ষত দেখে বিষয়টি পরিবারের সামনে প্রকাশ পায়।

​একই দিন বিকেলে ১৩ বছর বয়সী অপর শিক্ষার্থী মো. বোরহান আলীর ওপরও নেমে আসে একই ধরনের মধ্যযুগীয় বর্বরতা। বোরহানের বাবা মো. লাল মিয়ার লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রধান আসামি সোয়াইবের ভাইয়ের একটি অন্যায় কাজ শিক্ষককে না জানানোর অপরাধে বোরহানকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। এরপর তার মুখে কস্টেপ পেঁচিয়ে এবং হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পিটিয়ে শরীর রক্তাক্ত করা হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা মিলে উত্তপ্ত লোহার খুন্তি দিয়ে শিশু বোরহানের তলপেট, ডান ও বাম উরু এবং নিতম্বে নির্মমভাবে ছ্যাঁকা দিয়ে মারাত্মক পোড়া জখম করে। পরবর্তীতে গুরুতর আহত বোরহান আলীকে চিকিৎসার জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবার মাদ্রাসায় খোঁজ নিতে গেলে শিক্ষকরা তাকে অন্য শাখায় পাঠানোর মিথ্যা অজুহাত দিয়ে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালায়।

​স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অভিযুক্ত শিক্ষক মাওলানা সোয়াইব ইতিপূর্বেও একাধিকবার শিক্ষার্থীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছেন। প্রায় ৫-৬ মাস আগে সামান্য কারণে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে তার হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় স্থানীয় সামাজিক মধ্যস্থতায় জরিমানা ও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। পূর্বের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় প্রধান শিক্ষক সোয়াইব আরও বেপরোয়া ও হিংস্র হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

​পরপর দুই শিশুর ওপর অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনা জানাজানি হলে পুরো এলাকা জুড়ে তীব্র সামাজিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত শিক্ষক মাওলানা সোয়াইবকে মুন্সি মার্কেট এলাকা থেকে আটক করে রাখে এবং পরবর্তীতে গাছা থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। গাজীপুর মেট্রোপলিটন গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী জানান, ভুক্তভোগী শিশুদের পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আহত শিশুদের হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং প্রধান আসামি মাওলানা সোয়াইবকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলার অন্য অভিযুক্ত শিক্ষকদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে বিরামহীন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিশুদের ওপর এমন নৃশংস নির্যাতন মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় প্রকাশ করে। অতীতে বিচারে শিথিলতার সুযোগে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তাই এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িত সকল শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

Web: www.banglanewstv.net G-mail: banglanewstv17@gmail.com

প্রিন্ট করুন