প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

হিলিতে কাঁচামরিচের বাম্পার ফলন: চড়া দামে কৃষকের মুখে হাসি

প্রতিবেদক: নুরুজ্জামান হোসেন, হিলি (দিনাজপুর)

দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী হাকিমপুর উপজেলার হিলিতে অর্থকরী ফসল হিসেবে কাঁচামরিচের বাণিজ্যিক চাষাবাদে বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে স্বল্প উৎপাদন ব্যয়, সহজ ও নির্বিঘ্ন পরিচর্যা পদ্ধতি এবং বর্তমান খোলা বাজারে আকর্ষণীয় ও স্থিতিশীল মূল্যের কারণে সনাতনী ধানসহ অন্যান্য প্রথাগত ফসলের পরিবর্তে কৃষকরা এখন ব্যাপকভাবে কাঁচামরিচ আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। অনুকূল আবহাওয়া ও স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ধারাবাহিক পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত দিকনির্দেশনায় চলতি মৌসুমে ফসলের আশাতীত বাম্পার ফলন অর্জিত হয়েছে। বাজারে কাঁচামরিচের সন্তোষজনক ও চড়া পাইকারি দর বজায় থাকায় চাষিরা অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে ফসল সংগ্রহ ও বিক্রির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সরেজমিনে হাকিমপুর উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া, বোয়ালদার, খাট্টামাধবপাড়া এবং আলীহাট এলাকার প্রত্যন্ত মেঠোপথ ও ফসলি মাঠগুলো ঘুরে দেখা গেছে নয়নাভিরাম ও কর্মচঞ্চল এক দৃশ্য। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে সবুজ কাঁচামরিচের ক্ষেত। প্রতিটি গাছের ডালপালায় থোকায় থোকায় ঝুলছে সতেজ ও চকচকে কাঁচা মরিচ। সকালের মিষ্টি রোদ ওঠার সাথে সাথেই কৃষকদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়; মাঠে কেউ নিপুণ হাতে গাছ থেকে মরিচ তুলছেন, আবার কেউ তা ওজন করে বস্তাবন্দী করছেন পাইকারদের কাছে হস্তান্তরের জন্য।

চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলের কৃষকরা মূলত রোগবালাই প্রতিরোধী ও উচ্চফলনশীল জাত হিসেবে পরিচিত ‘মিসাইল’ জাতের মরিচ চাষে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। স্থানীয় কৃষিজীবীদের অভিমত অনুযায়ী, ধান বা অন্যান্য প্রচলিত দানাদার শস্যের আবাদে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দামের অনিশ্চয়তার ঝুঁকি বেশি থাকে, সেখানে মরিচ চাষে ঝুঁকি অনেক কম কিন্তু মুনাফার পরিমাণ বহুগুণ বেশি। এই চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, জমিতে মাত্র একবার স্বাস্থ্যকর চারা রোপণ করলে একটানা কয়েক মাস ধরে পর্যায়ক্রমে ফলন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। একই জমি থেকে বারবার মরিচ তুলে বাজারে বিক্রির এই সুযোগ কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করছে, যার ফলেই প্রতিবছরই এই অর্থকরী ফসলের চাষের পরিধি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

মাঠে কর্মরত কৃষক ইয়ানুল ইসলাম ও মাজেদুল হক সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, চলতি বছর আবহাওয়া পুরোপুরি অনুকূলে থাকায় মরিচের ফলন যেমন চমৎকার হয়েছে, তেমনি বাজারদরও গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে স্থানীয় পাইকারি বাজারগুলোতে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ একশত থেকে একশত বিশ টাকা পর্যন্ত পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও আনুষঙ্গিক যাবতীয় উৎপাদন ব্যয় বাদ দেওয়ার পরও তাদের হাতে বেশ ভালো অঙ্কের নিট মুনাফা থাকছে। বাজারে এমন অনুকূল পরিবেশ ও ন্যায্যমূল্য বজায় থাকলে আগামী মৌসুমে আরও বর্ধিত জমিতে মরিচ চাষের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন তারা।

হিলির উৎপাদিত কাঁচামরিচের গুণগত মান, অনন্য ঝাঁঝ ও সতেজতা উন্নতমানের হওয়ায় তা শুধু স্থানীয় বাজারের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং প্রতিদিন ট্রাকে করে রাজধানী ঢাকা, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় বিভাগীয় ও জেলা শহরের পাইকারি আড়তগুলোতে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। দূরদূরান্তে পণ্য সরবরাহের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থানীয় চাষিদের অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবহন খাত, মরিচ তোলা, গ্রেডিং বা বাছাইকরণ এবং লোড-আনলোডের সঙ্গে জড়িত বহু প্রান্তিক দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে নির্ভরযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই বছর আগেও এই উপজেলায় নামমাত্র দুই হেক্টর জমিতে কাঁচামরিচ আবাদ করা হতো। তবে লাভজনক হওয়ায় মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে চলতি মৌসুমে সেই আবাদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট হেক্টরে, যা শতকরা হিসেবে চার গুণ বৃদ্ধির এক অনন্য রেকর্ড।

এ বিষয়ে হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. আরজেনা বেগম জানান, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি জমিতে কৃষকরা মরিচ চাষ করেছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের মানসম্পন্ন বীজ নির্বাচন, সঠিক মাত্রায় সুষম সারের ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে পোকা ও রোগবালাই দমনে সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। আবহাওয়া অত্যন্ত সহায়ক থাকায় ফলনের মান যেমন চমৎকার হয়েছে, তেমনি কৃষকরাও তাদের কাঙ্ক্ষিত ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, যা আগামীতে এই অঞ্চলে মরিচ চাষের ব্যাপ্তি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ফসলের বহুমুখীকরণ ও কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল কাঁচামরিচ এক অপার সম্ভাবনাময় দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাজারে যদি বর্তমানের মতো ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত থাকে, তবে আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে মরিচের বাণিজ্যিক আবাদ আরও নতুন মাত্রা পাবে। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় কৃষি প্রশাসনের সার্বিক তদারকি বজায় থাকলে কাঁচামরিচ চাষ কেবল কৃষকের ঘরেই সচ্ছলতা আনবে না, বরং তা জাতীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও সমৃদ্ধ করতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে।

Web: www.banglanewstv.net G-mail: banglanewstv17@gmail.com

প্রিন্ট করুন