মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বইছে উত্তাল হাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিয়েছে ইরান। তবে এই জবাব প্রদানের সমান্তরালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তারা পাল্টা জবাব দিতে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো এই জবাবে ইরান ‘সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের’ ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে, বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলি অভিযান বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবারের মধ্যে ইরানের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করলেও সেই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পায়। রোববার কাতারের মেসাইদ বন্দরের দিকে যাওয়া একটি মালবাহী জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, জাহাজটি দেশটির জলসীমায় প্রবেশের পরপরই এই অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলার চেষ্টার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছে। যদিও আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুটি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করার দাবি করেছে, তবুও এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওই অঞ্চলে সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কুয়েত এবং দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের জাহাজ ও আকাশসীমায় অনুরূপ হামলার খবর জানিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকশিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় তাঁর অনমনীয় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ইরান কখনো শত্রুর কাছে মাথানত করবে না এবং আলোচনা করার অর্থ এই নয় যে তারা আত্মসমর্পণ করছে। এদিকে ইরানের সামরিক প্রধান আলী আবদুল্লাহি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির কাছ থেকে ‘শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখতে’ নতুন নির্দেশনা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, তেহরানের সংযমের সময় শেষ হয়ে এসেছে। মার্কিন যুদ্ধবিমান কর্তৃক ওমান উপসাগরে ইরানি জাহাজে গুলিবর্ষণের ঘটনার পর বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি আঘাত হানার হুমকি দিচ্ছে।

বর্তমানে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল সীমিত করেছে এবং এই রুট দিয়ে অতিক্রমকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের ব্যবস্থা চালু করেছে। বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয় বলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে থাকা ‘অগ্রহণযোগ্য’। বিপরীতে, মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি অবরোধ ও হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই কূটনৈতিক ও সামরিক স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন বিশ্ববাসীর নজরে। শান্তি প্রস্তাবের জবাবে যুদ্ধের দামামা বন্ধের কথা থাকলেও মাঠ পর্যায়ের হামলাগুলো ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}