কয়েক দিনের টানা সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌ-অচলাবস্থা চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রোববার কাতারের উপকূলে একটি মালবাহী জাহাজে ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনার পর এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। একই সাথে ইরান এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা বা কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরান থেকে পাওয়া এএফপির তথ্যমতে, কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, আবুধাবি থেকে তাদের জলসীমায় প্রবেশের সময় মেসাইয়িদের বন্দরের উত্তর-পূর্বে একটি মালবাহী জাহাজ ড্রোন আক্রমণের শিকার হয়।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, একটি বাল্ক ক্যারিয়ার অজ্ঞাত উৎস থেকে ছোড়া প্রজেক্টাইলে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। হামলার ফলে জাহাজটিতে ছোট আকারের অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা পরিবেশগত বিপর্যয়ের খবর পাওয়া যায়নি। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কেউ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজ দাবি করেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত ওই জাহাজটি মার্কিন পতাকাবাহী এবং এটি আমেরিকার মালিকানাধীন। এর আগে শুক্রবার ওমান উপসাগরে ইরানি পতাকাবাহী দুটি জাহাজে মার্কিন যুদ্ধবিমান গুলি চালিয়ে অচল করে দেওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে এই অস্থিতিশীলতা শুরু হয়।

পাল্টাপাল্টি এই সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছে, যদি ইরানের কোনো ট্যাংকার বা বাণিজ্যিক জাহাজে পুনরায় হামলা হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ‘ভারী হামলা’ চালানো হবে। শুধু কাতার নয়, ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র কুয়েতও তাদের আকাশসীমায় শত্রু ড্রোন শনাক্তের দাবি করেছে এবং সেগুলো প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। তেহরান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে এবং প্রতিটি জাহাজ থেকে টোল আদায়ের ব্যবস্থা চালু করেছে, যা বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে কূটনৈতিক ময়দানেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের জবাব ইরানের কাছ থেকে সময়মতো না পৌঁছানোয় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করছে। যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে লেবানন ফ্রন্টেও, যেখানে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি এখন একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কায় পুরো বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পারস্য উপসাগরের এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ড্রোন হামলার ঘটনাগুলো অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলকে আরও সংঘাতপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}