দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান এবং হবিগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক হাফিজুর রহমান নিয়নসহ তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫০ কোটি টাকার মানহানিকর মামলা দায়েরের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে হবিগঞ্জের সাংবাদিক সমাজ। আজ সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় জেলার কর্মরত সাংবাদিকরা এই মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে জেলার প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং অনলাইন গণমাধ্যমের বিপুল সংখ্যক সংবাদকর্মী অংশ নেন। দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী চলা এই মানববন্ধনে সাংবাদিকরা স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় হিসেবে কাজ করা এ ধরণের মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।

হবিগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি শোয়েব চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ সেলিমের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবালসহ প্রবীণ ও তরুণ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। প্রতিবাদ সভায় বক্তারা বলেন, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা সংবাদপত্রের পবিত্র দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি নামসর্বস্ব এনজিওর ১০ হাজার ৫৫৯ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের অসঙ্গতি নিয়ে। এটি ছিল জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন একটি প্রতিবেদন, যার সত্যতা পেয়ে খোদ নির্বাচন কমিশন ওই সংস্থার পর্যবেক্ষক নিয়োগ স্থগিত করে। অথচ সংবাদ প্রকাশের তিন মাস পর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই মামলা করা হয়েছে, যা স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার একটি নির্লজ্জ চেষ্টা মাত্র।

উল্লেখ্য, চুনারুঘাট উপজেলার বিরমপুর গ্রামে অবস্থিত ‘পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোস্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট’ (পাশা) নামে একটি নামসর্বস্ব এনজিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন পেয়েছিল। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে ‘এক ব্যক্তিনির্ভর পাশা দিচ্ছে ১০ হাজার নির্বাচন পর্যবেক্ষক’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো কর্মী বা স্থায়ী প্রকল্প নেই এবং এর নির্বাহী পরিচালক এককভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এমনকি নারীদের চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ ও পর্যবেক্ষক কার্ড বিক্রির অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে আসে। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের তদন্তে এই তথ্যের সত্যতা পাওয়ায় পাশার পর্যবেক্ষক নিয়োগ বাতিল করা হয়।

এই ঘটনার জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে পাশার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীর গত ৬ মে হবিগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫০ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, হবিগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক হাফিজুর রহমান নিয়ন এবং ঢাকা অফিসের নিজস্ব প্রতিবেদক রিয়াদুল করিমকে আসামি করা হয়েছে। আদালতের বিচারক তানজিনা রহমান তানিন মামলাটি আমলে নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবিলম্বে এই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পর ব্যবস্থা গ্রহণ করা নির্বাচন কমিশনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও, সেই তথ্যের উৎস সাংবাদিকদের ওপর মামলা দেওয়া আইনের অপব্যবহারের শামিল। গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছে সচেতন মহল।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}