সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ এক জনপদ হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ। ভৌগোলিক অবস্থান এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলটিকে বলা হয় ‘হবিগঞ্জের প্রবেশদ্বার’। সম্প্রতি শিল্পায়ন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং রেলওয়ে জংশনের আধুনিকায়নে শায়েস্তাগঞ্জ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। খোয়াই নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদটি এখন কেবল একটি উপজেলা নয়, বরং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এবং বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিতে এখানে দিন দিন কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
শায়েস্তাগঞ্জের প্রধান প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এর ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে জংশন। ব্রিটিশ আমল থেকে এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনগুলো এখানে যাত্রাবিরতি দেয়, যার ফলে হাজার হাজার যাত্রী এখান থেকে যাতায়াত করেন। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যাত্রীসেবার মান আরও উন্নত করা এবং প্ল্যাটফর্মের পরিধি বাড়ালে এটি দেশের সেরা জংশনগুলোর একটিতে পরিণত হবে। এছাড়াও শায়েস্তাগঞ্জকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী চুনারুঘাট ও মাধবপুরের চা বাগানগুলোর উৎপাদিত পণ্য পরিবহনেও রেল যোগাযোগ অনন্য ভূমিকা রাখছে।
পর্যটন খাতেও শায়েস্তাগঞ্জের নাম এখন পর্যটকদের তালিকার শীর্ষে। এখান থেকে খুব কাছেই রয়েছে চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা শায়েস্তাগঞ্জকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে যান। পর্যটকদের সুবিধার্থে শায়েস্তাগঞ্জ পৌর এলাকায় উন্নত মানের হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির চাকাকে আরও সচল করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শায়েস্তাগঞ্জকে যদি একটি পরিকল্পিত উপশহর হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে এটি কেবল পর্যটন নয়, বরং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটাবে।
তবে উন্নয়নের এই জোয়ারের মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যানজট নিরসন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে এটি একটি আদর্শ পর্যটন বান্ধব এলাকায় রূপান্তরিত হবে। শিল্পায়ন ও নগরায়নের এই দ্রুত প্রসারে পরিবেশ রক্ষায়ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আগামী দিনে শায়েস্তাগঞ্জ কেবল হবিগঞ্জের নয়, পুরো সিলেট বিভাগের এক আধুনিক মডেল টাউন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
যোগাযোগের সহজলভ্যতা আর ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নে শায়েস্তাগঞ্জ এখন সম্ভাবনার এক বিশাল ভাণ্ডার। প্রশাসনের সঠিক তদারকি আর পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে।