২০১৭ সালের পর থেকে ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমনের ফলে কক্সবাজারের স্থানীয় হোস্ট কমিউনিটি (আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়) যে ভয়াবহ মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তা এক দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের উপাখ্যান।
‎একটি দেশ কখনই অনন্তকাল ধরে অন্য দেশের বোঝা বহন করতে পারে না । এনজিওদের জন্য রোহিঙ্গা সংকট একটি প্রজেক্ট বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হতে পারে, তবে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অস্তিত্বের সংকট । দেশের ক্ষতি করে কোনো বিশেষ মহলের লাভবান হওয়ার এই ধারা বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের প্রধান দাবি।

‎রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে দেশ-বিদেশের বহু দাতাগোষ্ঠী ও এনজিও ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের নামে কোটি কোটি টাকার তহবিল পরিচালনা করছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য ও পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, এই বিশাল বাজেটের সিংহভাগই ব্যয় হয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের বিলাসী জীবনযাপন, আকাশচুম্বী বেতন এবং প্রশাসনিক খরচের পেছনে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের পেছনে সরাসরি সহায়তার চেয়ে ‘ওভারহেড’ বা অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচের পরিমাণ অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই, সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, এই বিশাল তহবিল প্রবাহ তত অব্যাহত থাকবে । এতে করে একশ্রেণির এনজিও কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এবং সংকট জিইয়ে রাখাতে তারা এক ধরণের পরোক্ষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
‎কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারা রোহিঙ্গাদের আগমনের পর থেকেই মারাত্মক দুরবস্থার মধ্যে আছেন । বিপুল সংখ্যক মানুষের বসতি গড়তে হাজার হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, মাদক চোরাচালান, মানবপাচার এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উগ্রবাদের মতো সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে ।
‎দেশী বিদেশী দাতা সংস্থা তথা এনজিওদের প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কর্তৃক উখিয়া- টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীদের (হোস্ট কমিউনিটি) জন্য ত্রাণ সহায়তার ২৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার জন্য বিধান থাকলেও বেশীরভাগ এনজিও এই নিয়ম মানেনা। নিয়ম অমান্যকারী এনজিওর বিরুদ্ধে সরকার ত্রাণ কার্যক্রম সাময়িক বা চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে পারলেও এখনো কোন শাস্থির ব্যবস্থা রাখা যায়নি।
‎এনজিওগুলো মূলত এনজিও বিষয়ক ব্যুরো থেকে অনুমোদনের ভিত্তিতে কাজ করে। এই নির্দেশিকা না মানলে বা নিয়ম ভঙ্গ করলে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো তাদের অনুমোদনের নবায়ন বন্ধ বা বাতিল করতে পারে।
‎এনজিওর প্রকল্প কার্যক্রমের বার্ষিক অডিট রিপোর্টে স্থাানীয়দের ২৫ শতাংশ সহায়তার বিষয়টি না থাকলে অডিট আপত্তি উঠতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
‎রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিলেও, এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থাান হোস্ট কমিউনিটিকে তাদের নিজস্ব এলাকায় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক করে তুলছে। স্থাানীয় জনগণের এই আত্মত্যাগ ও দুঃখের বোঝা দীর্ঘমেয়াদী, যার সুষ্ঠু সমাধান ও মানবিক প্রত্যাবাসনই কেবল এই অবস্থার অবসান ঘটাতে পারে ।

‎এনজিও এবং আইএনজিওদের মানবিক সহায়তার আড়ালে স্থানীয়দের ন্যায্য অধিকার খর্ব করা এবং উন্নয়নের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে ।
‎এনজিওগুলোতে প্রচুর চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হলেও স্থানীয়দের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে বহিরাগত ও অনভিজ্ঞ লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া, এবং স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের উপেক্ষা করা হয় চরম ভাবে।
‎অনেক সময় নিয়োগের শর্তে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন অজুহাতে তাদের বাদ দেওয়া হয়।

‎বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। স্থানীয়রা আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে চাল, মাছ ও সবজি কিনতে হচেছ, যা স্থানীয় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অসহনীয়।
‎রোহিঙ্গারা কম মজুরিতে কাজ করায় স্থানীয় দিনমজুররা কাজ হারিয়েছে। স্থানীয় যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি।
‎রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপন করতে গিয়ে হাজার হাজার একর সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কাটা হয়েছে। অনেক চাষযোগ্য জমি এখন আর আবাদ করা যাচেছ না, যা স্থানীয়দের প্রধান আয়ের উৎস ছিল।
‎ক্যাম্পের ভেতরে ও আশেপাশে চুরি, ডাকাতি ও মাদক ব্যবসার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধী চক্রের কারণে স্থানীয় এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
‎বিপুল মানুষের চাপে এলাকার রাস্তাঘাট, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা তাদের নিজস্ব জমি ও সম্পদ ব্যবহার করতে পারছেন না, যা তাদের জন্য চরম হতাশার কারণ। মাদক এর ভয়াবহ পরিস্থিতি যুবসমাজের ধ্বংসের কারন। রাস্ট্রের নিরাপত্তা আজ হুমকির সম্মুখীন। দেশের অপার সম্ভাবনা ময় পর্যটন শিল্পের বিকাশের পথ রুদ্ধ হওয়ার পথে।

‎বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয় জানিয়েছে, তারা সরকার ও এনজিওগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, সুরক্ষাসহ জরুরি জীবনরক্ষাকারী সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিতে কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা কমার আশঙ্কাসহ রাখাইন রাজ্যে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
‎বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ আরো জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ রাখাইন এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। সেখানে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জান্তার পাশাপাশি অন্যদের সম্পৃক্ততা জরুরি। কিন্তু গৃহযুদ্ধে মুখোমুখি দুটি পক্ষের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হচেছ না। বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোয় সব মিলিয়ে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখেরও বেশি। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ২০১৭ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারে তৎকালীন ক্ষমতাসীন অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল, যার মধ্য¯স্থতায় ছিল চীন। এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটিকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ১ লাখ ৮০ হাজার জনকে সম্প্রতি মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেছে দেশটি। তাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত নয়।
‎বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের সংরক্ষিত বন রোহিঙ্গাদের বসতি নির্মাণের কারণে ধ্বংস হয়েছে। আবার রোহিঙ্গাদের অবস্থান স্থানীয় বাংলাদেশীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্য ও কাজের সুযোগের অভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে স্থানীয় নিম্ন আয়ের অনেক মজুর কাজ হারাচেছন। কারণ পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গারা অনেক কম দামেও শ্রম বিক্রিতে আগ্রহী।
‎সরজমিন তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, কক্সবাজার অঞ্চলে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, লবণ চাষ, কৃষি বা নির্মাণসহ যেসব খাতে শ্রমিক প্রয়োজন, সেখানে রোহিঙ্গারা কাজে যুক্ত হচেছন। এতে স্থানীয়রা বেকার হয়ে অমানবিকতার কারনে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হচেছ। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এখানে মাদক চোরাচালানের প্রবণতা দিনদিন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। জানা যায়, সীমানার ওই পাড়ে গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বর্তমান নিয়ন্ত্রণকারীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইয়াবার মতো মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এক্ষেত্রে সস্তায় মাদক বহনকারী হিসেবে রোহিঙ্গারা ব্যবহৃত হচেছ।
‎ক্যাম্প নির্মাণের ফলে যে পরিমাণ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, তা পুনঃবৃক্ষায়নের মাধ্যমে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া।
‎কক্সবাজারের রাস্তাঘাট ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ কমাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ করা।
‎রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবল মানবিক সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত হবে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া এবং একই সাথে ¯’ানীয় জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি লাঘবে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
‎এই অচলাবস্থা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর কঠোর তদারকি, স্থানীয়দের জন্য পৃথক কর্মসংস্থান কোটা সংরক্ষণ এবং ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি হোস্ট কমিউনিটির পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

‎লেখকঃ এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী – মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি, সহ-সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন, পরিষদ, উখিয়া।।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}