কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরএসও) সদস্যদের মধ্যে এক ভয়াবহ ও ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। নাফ নদীর তীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় সংঘটিত এই সম্মুখ যুদ্ধে বিজিবির সুপরিকল্পিত ও কঠোর অভিযানের মুখে আরএসও সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই তীব্র গুলিবিনিময়ের ঘটনায় কোনো পক্ষেরই হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বিজিবি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আরএসও-এর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক আগ্নেয়াস্ত্র, তাজা গোলাবারুদ এবং ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

সীমান্তের নথিসূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (৩ জুন) দুপুরে উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধীনস্থ পালংখালী বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকা আঞ্জুমান পাড়া বাহারপ্যারা সীমান্তে নাফ নদীর তীরবর্তী এলাকায় এই রোমাঞ্চকর ঘটনাটি ঘটে। বিজিবি সূত্রে প্রকাশ, আঞ্জুমান পাড়া বাহারপ্যারা সীমান্ত এলাকায় নাফ নদীর তীরে গোলপাতা দিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী ছাউনিতে ৫ থেকে ৬ জন ভারী অস্ত্রধারী আরএসও সদস্য অবস্থান করছে—এমন একটি সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য পায় বিজিবি। এই গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উখিয়া ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসারের কঠোর নির্দেশনায় দুপুর আনুমানিক ১টা ৪০ মিনিটের দিকে বিজিবির একটি বিশেষ ও চৌকস টহল দল ওই দুর্গম এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযান চলাকালীন বিজিবির বিশেষ টহল দলটি আরএসও সদস্যদের গোপন আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছামাত্রই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি বিজিবিকে লক্ষ্য করে আকস্মিক ও অতর্কিতভাবে ৩ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে আন্তর্জাতিক সীমান্তে মুহূর্তের মধ্যে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়। বিজিবি সদস্যরাও কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার্থে পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং নিজেদের আধুনিক এসএমজি (Submachine Gun) থেকে ৫ রাউন্ড পাল্টা গুলি বর্ষণ করে। বিজিবির এমন কঠোর, নিখুঁত ও দূরদর্শী অবস্থানের মুখে টিকতে না পেরে সশস্ত্র আরএসও সদস্যরা তাদের ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদ ফেলে রেখে নাফ নদীর দিকে জীবন বাঁচাতে দ্রুত পালিয়ে যায়।

গোলাগুলির অবসান ঘটার পর বিজিবির বিশেষ টহল দলটি আরএসও সদস্যদের ফেলে যাওয়া ওই অস্থায়ী ছাউনির ভেতরে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। তল্লাশিতে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম, আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে ১টি জি-৩ ব্যাটল রাইফেল, ৩টি জি-৩ ম্যাগাজিন, ৩টি ফাইবার ম্যাগাজিন এবং ৫১৫ রাউন্ড জি-৩ রাইফেলের তাজা গুলি। এছাড়া ১টি ওয়াকিটকি সেট, ১টি মোবাইল ফোন, ২টি সিমকার্ড এবং ৪,০০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। একই সাথে সেখান থেকে ২টি আরএসও মনোগ্রাম, ১টি পাউচ, ২টি লুঙ্গি, ১টি টি-শার্ট, ১২ প্যাকেট সিগারেট এবং নগদ ২০ টাকা (দুটি ১০ টাকার নোট) জব্দ করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বিজিবি জানিয়েছে, এই সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনায় কোনো পক্ষেই হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম মধ্যরাতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, উখিয়া সীমান্তে আরএসও-এর সাথে গোলাগুলি ও মালামাল উদ্ধারের ঘটনার সত্যতা রয়েছে। তবে উদ্ধারকৃত বিপুল সামরিক মালামাল এবং অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিস্তারিতভাবে গণমাধ্যমকে অবহিত করা হবে। বিজিবির অন্য একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধারকৃত অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মাদকের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ ও মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া বর্তমানে জোরালোভাবে চলমান রয়েছে।

উখিয়া সীমান্তে বিজিবির এই বীরত্বপূর্ণ অভিযান ও বিপুল অস্ত্র-মাদক উদ্ধার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সীমান্ত সুরক্ষায় আরএসও-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর এমন অনুপ্রবেশ রুখতে নাফ নদী ও তৎসংলগ্ন আঞ্জুমান পাড়া বাহারপ্যারা সীমান্তে বিজিবির এমন কঠোর টহল ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা সর্বদা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}