মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় কক্সবাজারের টেকনাফ থানাধীন শাহপরীরদ্বীপের পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে এক ভয়াবহ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকাটি উল্টে যাওয়ার পর স্থানীয় সাহসী জেলেদের দ্রুত তৎপরতায় জীবিত অবস্থায় ১৮ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১৪ জন সাধারণ রোহিঙ্গা এবং ৪ জন মাঝিমাল্লা রয়েছেন, যারা সবাই উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। পরবর্তীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা শুরু করে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ পশ্চিম পাড়া উপকূল নৌঘাট থেকে প্রায় ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটার দূরে সাগরে এই দুর্ঘটনাস্থলটি চিহ্নিত হয়। প্রবল স্রোত ও বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কারণে মিয়ানমার দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকাটি একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সাগরে ডুবে যায়। নৌকাডুবির দৃশ্য দেখতে পেয়ে শাহপরীরদ্বীপের স্থানীয় জেলেরা দুটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নামেন। জেলেদের তাৎক্ষণিক সাহসিকতা ও প্রচেষ্টায় সাগর থেকে ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করে নৌঘাটে নিয়ে আসা হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনা কবলিত ওই নৌকাটিতে মোট ২৭ জন রোহিঙ্গা যাত্রী ছিল বলে জানা গেছে।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যে চারজন মাঝিমাল্লা ছিলেন তারা হলেন উখিয়ার বালুখালী ও জামতলী এবং টেকনাফের জাদিমুড়া ও শালবাগান রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা নুর আলম (৩৭), জাহেদ হোসেন (৪২), সৈয়দ নুর (২৭) এবং নুর কামাল (৪০)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিজিবির হেফাজতে নেওয়া এই ১৮ জন রোহিঙ্গা নাগরিকের সবাই সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসার (ARSA) সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে অবস্থান নিয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন। উদ্ধারকৃতদের অনেকে এক বছর এবং কেউ কেউ দুই বছর ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন বলে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি সেখানে যুদ্ধবিরতি ও তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় তারা নাফ নদী ও সাগরপথ ব্যবহার করে গোপনে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।

উদ্ধার ও আটকের পর বিজিবির সদস্যরা উদ্ধারকৃতদের বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে চিকিৎসার জন্য টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, বিজিবি কর্তৃক নিয়ে আসা ১৮ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে এবং তাদের শরীরে বড় ধরনের কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা শেষে বিজিবি সদস্যরা তাদের পুনরায় হেফাজতে নিয়ে পরিচয় যাচাই-বাছাই করেন। টেকনাফ মডেল থানার ওসি (তদন্ত) সুকান্ত জানান, বিজিবি ইতোমধ্যেই ১৬ জন রোহিঙ্গাকে থানায় হস্তান্তর করেছে এবং বাকি দুইজনকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আটক সবার পরিচয় যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং আরসা সদস্যদের প্রবেশের এই চেষ্টা টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় জেলেদের সময়োচিত ভূমিকা যেমন প্রাণহানি কমিয়েছে, তেমনি বিজিবি ও পুলিশের দ্রুত আইনি পদক্ষেপ সীমান্ত সুরক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতাকে পুনরায় প্রমাণ করেছে।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}