দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় আগাছা দমনের জন্য কীটনাশক প্রয়োগের পর রোপিত আমন ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির এক আশঙ্কাজনক অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, নিম্নমানের কিংবা ভুলভাবে ব্যবহৃত আগাছানাশকের বিষক্রিয়ার কারণে উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির উদীয়মান ধানগাছ সম্পূর্ভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। বড়মহেশপুর, শিমর, শিবরামপুর, কয়রা, কালিয়া এবং তিখুর এলাকার ভুক্তভোগী কৃষকেরা স্থানীয় ভাদুরি সাধারণ বাজারের ‘মেসার্স হৃদয় ট্রেডার্স’ নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে উক্ত আগাছানাশক ক্রয় করে নিজ নিজ জমিতে প্রয়োগ করেছিলেন।

জমিতে কীটনাশক ছিটানোর মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেখা দেয় চরম বিপত্তি। সবুজ শ্যামল ধানগাছের স্বাভাবিক রং দ্রুত হলুদ হয়ে যেতে শুরু করে। এর পরপরই গাছগুলো অদ্ভুতভাবে কুঁকড়ে গিয়ে পচতে থাকে এবং অনেক জমিতে রোপণ করা ধানগাছ সম্পূর্ণরূপে মরে শুকিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে পুনরায় নতুন করে ধানের চারা রোপণ করেও কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে শত শত কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলি জমি এখন প্রায় ধূ-ধূ প্রান্তরে পরিণত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাবু মিয়া অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, আমন ধান চাষের প্রাথমিক খরচ জোগাতে অনেক প্রান্তিক কৃষক বিভিন্ন এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে এবং চড়া সুদে অর্থ ধার করে বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের যাবতীয় খরচ চালিয়েছিলেন। কিন্তু এনজিওর ঋণ ও ধারের টাকায় বোনা সেই ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা এখন চরম আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। তিনি অবিলম্বে ঘটনার সঠিক তদন্ত, দায়ী কীটনাশক বিক্রেতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। এ লক্ষ্যে বাবু মিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন, যেখানে সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তার আকুল আবেদন জানানো হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান মেসার্স হৃদয় ট্রেডার্সের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন যে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে। তবে ঠিক কীভাবে বা কী উপায়ে এর মীমাংসা হয়েছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য না জানিয়েই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফোন কেটে দেন। অন্যদিকে নবাবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম ইলিয়াস জানান, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো পরিদর্শন করেছেন। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ২০০ বিঘা জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত মনে হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, ধান নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের লক্ষ্যে জমি থেকে মাটি, পানি, রোপিত ধানের চারা এবং ব্যবহৃত আগাছানাশকের উপাদান সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ল্যাব টেস্টের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রকৃত দায়ী নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী কৃষকেরা চান প্রশাসন দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে ঘটনার মূল কারণ উন্মোচন করুক, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করুক এবং বাজারে হরহামেশাই বিক্রি হওয়া বিভিন্ন কীটনাশকের মান ও অনুমোদন নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

নবাবগঞ্জে আগাছানাশক ব্যবহারে বিপুল পরিমাণ জমির ধান বিনষ্ট হওয়া প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশক বাজারজাতকারীদের আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জরুরি সরকারি সহায়তা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}