গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানাধীন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাজর এলাকায় এক অসহায় অটোরিকশা চালককে বসতবাড়ি থেকে প্রকাশ্যে টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিয়ে গাছে বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতন, নারীর শ্লীলতাহানি এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জমির দলিল ও ব্যাংকের চেক জিম্মি করার এক রোমহর্ষক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। গরু চুরির মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে মো. মানিক (৩০) নামের ওই নিরীহ চালকের ওপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী চক্র। এই মর্মান্তিক ঘটনায় মামলা দায়ের ও পুলিশি অভিযানে ছিনতাই হওয়া নথিপত্র উদ্ধার হলেও গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষে ফুসে উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ জনগণ।

ঘটনার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে অভিযুক্ত হাবিবুল্লাহর গোয়ালঘর থেকে তিনটি গরু চুরির ঘটনা ঘটে। এই চুরির ঘটনায় কোনো প্রকার তথ্য-প্রমাণ বা তদন্ত ছাড়াই সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে প্রতিবেশী অটোরিকশা চালক মানিকের ওপর সমস্ত দায় চাপানো হয়। ওই দিনই সকাল সাড়ে ৬টার দিকে স্থানীয় সন্ত্রাসী ইমরান, জাহাঙ্গীর মামুন, হাবিবুল্লাহ, রাহাদ ও ফরহাদ সংঘবদ্ধ হয়ে মানিকের বসতবাড়িতে অনাধিকার প্রবেশ করে হামলা চালায় এবং তাকে টানা-হেঁচড়া করে বাড়ি থেকে বের করে আনে। পরবর্তীতে প্রকাশ্য দিবালোকে মানিককে একটি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে শরীর মারাত্মকভাবে থেঁতলে দেওয়া হয়। ৩ নম্বর আসামি জাহাঙ্গীর মামুন লোহার রড দিয়ে মানিককে নির্বিচারে পেটাতে পেটাতে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার প্রত্যক্ষ চেষ্টা চালায়। এ সময় স্বামীকে বাঁচাতে মানিকের স্ত্রী মৌসুমি আক্তার এগিয়ে এলে ১ নম্বর আসামি ইমরান তার পরনের জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি ঘটায় এবং তাকেও নির্মমভাবে মারধর করে।

অভিযুক্ত আসামিরা চুরির কথিত ক্ষতিপূরণ বাবদ নগদ ৬ লাখ টাকা দাবি করে এবং টাকা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি প্রদর্শন করে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে জিম্মি ও চিকিৎসাধীন মানিককে বাঁচাতে তার স্ত্রী তাদের ধীরাশ্রম মৌজাস্থিত নিজ জমির মূল দলিল এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ২টি স্বাক্ষর করা ব্লাঙ্ক চেক সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেন। খবর পেয়ে ওই দিন দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে গাছা থানা পুলিশ দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে আসামি হাবিবুল্লাহ এবং তার দুই ছেলে রাহাদ ও ফরহাদকে। তবে মূল হোতা ইমরান ও অতীতে বাস ডাকাতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি জাহাঙ্গীর মামুন পুলিশ ও সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে কৌশলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে রক্তাক্ত ও মূমুর্ষু মানিককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ বিষয়ে গাছা থানার কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী জানান, ভুক্তভোগী মানিকের পরিবারের পক্ষ থেকে এজাহার দায়েরের পর থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ সফল অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের অবৈধ দখল থেকে মানিকের ছিনতাই হওয়া জমির দলিল ও ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দুটি চেক উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এবং বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে ঘটনার দিন গভীর রাতে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ছাড়িয়ে নিতে গাছা থানায় আসেন স্থানীয় বিএনপি নেতাদের এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হামিদ মন্ডল ও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে গভীর রাতে ওসির কক্ষে হাজির হয়ে মামলা না নেওয়া ও আটক আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার চরম চাপ সৃষ্টি করেন। সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ জানালে অনৈতিক অর্থের বিনিময়ে সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার অপচেষ্টা চালানো হয়। তবে সাংবাদিকদের শক্ত অবস্থানের মুখে অপচেষ্টা ব্যর্থ হলে রাত ২টার দিকে তারা থানা ত্যাগ করেন। পরদিন পুলিশ আটক আসামিদের আদালতে প্রেরণ করলে আদালত থেকে আসামিরা দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে, যা ভুক্তভোগী পরিবারকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে।

 অসহায় চালকের ওপর এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের অনৈতিক মধ্যস্থতা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চিহ্নিত আসামিদের পুনরায় আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}