একসময় গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ মেঠোপথ কিংবা সবুজ প্রান্তরে বিকেল নামলেই শুরু হতো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর হাডুডুর আসর। শ্বাসরুদ্ধকর টানটান উত্তেজনায় দম ধরে অবিরাম ‘হাডুডু’ শব্দ উচ্চারণ করতে করতে প্রতিপক্ষের সীমানায় প্রবেশ এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ফিরে আসার সেই লড়াই দেখতে চারপাশের পরিবেশ মুখরিত হয়ে উঠত। শুধু যে খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণেই মাঠ মুখর থাকত তা নয়, বরং নারী, পুরুষ, প্রবীণ ও শিশু-কিশোর নির্বিশেষে গোটা গ্রামের মানুষ ভিড় জমাতেন খেলার মাঠের সীমানায়। একটি মাত্র খেলাকে কেন্দ্র করে পুরো পল্লী জনপদে রূপ নিত এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর মিলনমেলায়।
কালের আবর্তে সময় বদলেছে এবং সেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে গ্রামীণ জীবনধারায় মানুষের বিনোদনের ধরনেও। উন্মুক্ত মাঠের কোলাহলমুখর স্থানটি এখন অনেকটাই গ্রাস করেছে ডিজিটাল স্মার্টফোন, অনলাইনভিত্তিক ভিডিও গেম ও ভার্চুয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অন্যদিকে অপরিকল্পিত বসতবাড়ি নির্মাণ ও নানাবিধ অবকাঠামোগত ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে খেলাধুলার উন্মুক্ত প্রান্তর, এমনকি কোথাও কোথাও মাঠের অস্তিত্বই চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মিত প্রতিযোগিতা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার দীর্ঘদিনের অভাব। ফলে গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ মাখা ঐতিহ্যবাহী এই লোকজ খেলাটি ক্রমশ কালের অতল গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের ভার্ণাপাড়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে এই চরম বাস্তবতা ও করুণ চিত্রই প্রত্যক্ষ করা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, একসময় এই জনপদে অত্যন্ত উদ্দীপনার সঙ্গে নিয়মিত হাডুডু খেলার বর্ণাঢ্য আয়োজন হতো। দূর-দূরান্ত থেকে শক্তিশালী দলগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসত এবং বিকেল থেকে গোধূলিলগ্ন পর্যন্ত উন্মুক্ত মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ থাকত হাজারো ক্রীড়ামোদীর ভিড়ে। তবে বর্তমানে সেই খেলার প্রান্তরে খেলোয়াড়দের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ মাঠের ধুলোবালির পরিবর্তে ডিজিটাল ডিভাইসের পর্দার ভেতর অনলাইনের কৃত্রিম জগতেই তাদের মূল্যবান অবসর সময় পার করছে।
ভার্ণাপাড়া গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফয়েজ উদ্দিন অত্যন্ত আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, অতীতে গ্রামীণ বিনোদনের প্রাণভোমরা ছিল এই হাডুডু খেলা। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলতেই কিশোর ও যুবকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটে যেতো মাঠে। কিন্তু বর্তমানে খেলার মাঠে প্রকৃত খেলোয়াড়ের চেয়ে হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে বসে থাকা অলস তরুণের উপস্থিতিই বেশি পরিলক্ষিত হয়।
এ বিষয়ে এলাকার প্রবীণ খেলোয়াড় মোহাম্মদ মোকসেদ আলী অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, গ্রামীণ মানুষের অন্তরে খেলাটির প্রতি টান ও ভালোবাসা এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। তবে নিয়মিত খেলার মাঠের সংকট, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অপ্রতুলতা এবং কোনো ধারাবাহিক টুর্নামেন্ট না থাকার কারণেই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও এটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
আরেক প্রবীণ খেলোয়াড় মোহাম্মদ আবু বক্কর সিদ্দিক অতীত স্মৃতি হাতড়ে বলেন, বিকেল হলেই একসময় তাদের মন মাঠে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠত। হাডুডুর প্রতি সমাজের প্রতিটি মানুষের এক অনন্য আকর্ষণ ছিল এবং ভালো খেলোয়াড়েরা সমাজেও বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান পেতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই অনুকূল ক্রীড়া পরিবেশ সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেছে, যার কারণে নতুন প্রজন্মের মাঝে এই খেলাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ গড়ার কোনো তাগিদ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
হাডুডু কেবল পেশিশক্তি প্রদর্শন কিংবা শারীরিক কসরতের সাধারণ খেলা নয়, এটি গ্রামীণ সমাজের চিরায়ত ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য ও সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি সাধারণ ম্যাচকে ঘিরে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হতো নিবিড় সংযোগ, বৃদ্ধি পেত সামাজিক হৃদ্যতা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক বন্ধুত্ব। স্থানীয় শিক্ষক আফতাব উদ্দিন সরকার জানান, অতীতে তিনি নিজেও এই ঐতিহ্যবাহী খেলার সঙ্গে সক্রিয় খেলোয়াড় ও দক্ষ সংগঠক হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি মনে করেন, শিশু ও কিশোরদের কেবল চার দেয়ালের মধ্যে পুঁথিগত পড়াশোনা এবং মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তির নিগড়ে বন্দি করে রাখলে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও সামাজিক মানসিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তাই আবহমান বাংলার এই নিজস্ব ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
খেলাটির ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, বছরের কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে দায়সারাভাবে একবার আয়োজন করলেই প্রাচীন এই খেলা টিকে থাকবে না। খেলাটিকে কার্যকরভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা, সঠিক প্রশিক্ষণ ও খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করতে আকর্ষণীয় পুরস্কারসহ নির্ভরযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতার বন্দোবস্ত করা আবশ্যক। ঘোড়াঘাট উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, হাডুডুসহ অন্যান্য গ্রামীণ খেলাগুলোকে স্বমহিমায় ধরে রাখতে সুপরিকল্পিত প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং তরুণদের জন্য মাঠ ব্যবহারের উন্মুক্ত সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।
ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন জানিয়েছেন, ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলাধুলা আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির মূলভিত্তি। হাডুডুর মতো ঐতিহ্যবাহী খেলা যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ের ক্রীড়া সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় সাধন করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুকূল সুযোগ রয়েছে।
গ্রামবাংলার মাটির টানযুক্ত ঐতিহাসিক হাডুডু খেলাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে কেবল খেলোয়াড় তৈরির প্রয়াস নিলেই চলবে না। একই সঙ্গে প্রয়োজন খেলাধুলার উন্মুক্ত মাঠ সংরক্ষণ, নিয়মিত টুর্নামেন্টের আয়োজন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত পৃষ্ঠপোষকতা। বিশেষ করে বিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক ক্রীড়া কার্যক্রমে এই খেলাটিকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্ম আবার মাঠে ফিরতে আগ্রহী হবে। অন্যথায় আধুনিকতার প্রবল আগ্রাসনে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে গ্রামীণ মাঠের সেই পরিচিত প্রাণের হাঁক। আমাদের শেকড়ের সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষায় মাঠের বুকে আবারো বজ্রকণ্ঠে ফিরিয়ে আনতে হবে সেই চিরচেনা সুর—‘হাডুডু… হাডুডু…’।