আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সার্বিক উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে গেছে। সচল থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে একের পর এক কারিগরি জটিলতা দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ঘন ঘন ও তীব্র লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জনজীবন, কৃষিকাজ এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডকে চরম ভোগান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সার্বিক পরিস্থিতি ও উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়টি মঙ্গলবার বিকেল চারটায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল সঞ্চালন ব্যবস্থায় কারিগরি বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রটির সবগুলো ইউনিটই বর্তমানে অচল হয়ে পড়েছে। এই আকস্মিক বিদ্যুৎ ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর উপজেলাসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়।
পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরে প্রধান প্রকৌশলী আরও জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সচল থাকা ইউনিটগুলোতে ধাপে ধাপে জটিলতা তৈরি হয়। যার ধারাবাহিকতায় গত সোমবার সকালের দিকে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে কেন্দ্রটির ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১ নম্বর ইউনিটের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা। এরপরও অপর সচল ইউনিটের ওপর নির্ভর করে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা অব্যাহত ছিল।
তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার সকালে। এ সময় কেন্দ্রটির তুলনামূলকভাবে বড় এবং শক্তিশালী ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিটটিতেও একই ধরনের গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় প্রকৌশলীরা তাৎক্ষণিকভাবে ৩ নম্বর ইউনিটের উৎপাদন কার্যক্রমও পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। ফলে একের পর এক দুটি প্রধান ইউনিটই অকার্যকর হয়ে পড়ায় কয়লাভিত্তিক এই পুরো বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
উত্তরাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে। পার্বতীপুরসহ আশপাশের শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিং দেখা দেওয়ায় স্থানীয় অধিবাসীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগে মারাত্মক অচলাবস্থা তৈরির পাশাপাশি গৃহস্থালি কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটছে।
যদিও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক আশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও কারিগরি দল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ত্রুটি শনাক্ত করে তা মেরামতের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গভীর পর্যবেক্ষণ ও জোর তৎপরতায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এসব যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে তুলে পুনরায় স্বাভাবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিটটি দীর্ঘ সময় ধরে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কারিগরি ও যান্ত্রিক জটিলতার কারণে ২০২০ সালের নভেম্বর মাস থেকেই ইউনিটটির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই ২ নম্বর ইউনিটটি অতীতে যখন সচল ছিল, তখন তা থেকে নিয়মিতভাবে দৈনিক গড়ে ৬৫ থেকে ৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় থাকা সেই ইউনিটের সঙ্গে এবার সচল দুটি ইউনিটও বিকল হয়ে পড়ায় কেন্দ্রটিতে নজিরবিহীন উৎপাদন বিপর্যয় নেমে এসেছে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবন স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দ্রুত চালু করা অত্যন্ত জরুরি। ঘন ঘন যান্ত্রিক গোলযোগ এড়াতে কেন্দ্রটির সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া জোরদার করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কারিগরি সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ত্রুটি সারিয়ে কেন্দ্রটিকে পুরোদমে উৎপাদনে ফেরানো না গেলে উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।