তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিতিশীলতা নিরসনে এবং কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে ফেরার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকার ইতিমধ্যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এমতাবস্থায় এই বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শ্রমিকদের সকল প্রকার আন্দোলন ও বিক্ষোভ স্থগিত রাখা একান্ত প্রয়োজন। মালিকপক্ষ মনে করেন, শ্রমিকদের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রাজপথের আন্দোলনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধান হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে শুধু শ্রমিকদের দাবির দিকে নজর দিলেই হবে না, বরং সমান্তরালভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) বর্তমান প্রশাসক মো. ফজলুল হক গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা এবং বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি একটি কাঠামোগত ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মীমাংসা হওয়া উচিত। এই প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করতে হবে। তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে জানান, আগে প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড পর্যালোচনার একটি নির্দিষ্ট বিধান কার্যকর ছিল। ২০২১ সালে যখন সর্বশেষ মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, তখন পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বাধ্যতামূলকভাবে বেতন বৃদ্ধির একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর নির্ধারণ করে। শুধু তাই নয়, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ থেকে একলাফে ৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ওই সময়কার প্রতিকূল অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির মধ্যেও মালিকপক্ষ অত্যন্ত উদারতার সাথে শ্রমিকদের কল্যাণে নেওয়া সরকারের এই সিদ্ধান্ত সানন্দে মেনে নিয়েছিল।
মো. ফজলুল হক আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া ওই তিন বছরের সময়সীমা আগামী জানুয়ারি মাসেই শেষ হতে যাচ্ছে। তাই বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি কোনোভাবেই মিছিল, মিটিং বা রাজপথ অবরোধের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সমাধান করতে হবে এবং এর জন্য সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা অপরিহার্য। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ওপরও তিনি সমানভাবে জোর দেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, শুধুমাত্র বেতন বাড়ানোর দাবি উত্থাপন করলেই হবে না; শিল্পের সেই পাহাড়সম বাড়তি ব্যয়ভার বহন করার মতো প্রকৃত সক্ষমতা আদৌ রয়েছে কি না, সেটিও অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রমিকদের জীবনের দুঃখ-কষ্টের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তিনি বলেন, যেকোনো সংকট ও সমস্যার সমাধান নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি পথেই হওয়া উচিত। বর্তমান সরকার যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, সেখানে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দুজন করে প্রতিনিধি এবং সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা সরাসরি অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সুতরাং, এই বোর্ডের গঠনমূলক আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ওপর সংশ্লিষ্ট সকলের পরিপূর্ণ আস্থা রাখা প্রয়োজন। কারখানায় উৎপাদন বন্ধের সংখ্যা সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান, উত্তরা এলাকায় আট থেকে দশ দিন আগেই বিচ্ছিন্ন কিছু মিছিলের মাধ্যমে শ্রমিক অসন্তোষের প্রারম্ভিক পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল। তাই বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং শিল্পের চাকা সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চরম ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
অন্যদিকে, রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পমালিকদের প্রভাবশালী সংগঠন বিকেএমইএর বর্তমান কমিটির নির্বাহী সভাপতি এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসানও চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তার সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের কাঙ্ক্ষিত বেতন নির্ধারণের জন্যই সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই এই মুহূর্তে চলমান আন্দোলনের প্রকৃত নেপথ্য কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র আন্দোলন দমনের চিন্তা না করে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা ও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই জটিল পরিস্থিতির একটি টেকসই সমাধান বের করা প্রয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের পরও কেন এই আন্দোলন চলছে এবং এর পেছনের মূল দাবিগুলো কী, তা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি শিল্প সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। পরিশেষে, তিনি শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা এবং দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে একটি স্বাভাবিক, নিরাপদ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত এবং কার্যকর উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের যেকোনো অস্থিতিশীলতা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মালিকপক্ষের নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে মজুরি কাঠামোর সমাধানের এই আহ্বান এবং নতুন মজুরি বোর্ডের প্রতি আস্থা স্থাপনের বিষয়টি শিল্পে শান্তি ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন সকল পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।