নতুন এক স্বাধীন দেশ গঠনের বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার আপামর জনসাধারণ। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই সদ্য স্বাধীন এই নবীন দেশের বুকে চেপে বসে একদলীয় বাকশালি শাসনের জগদ্দল পাথর। সুশাসনের অভাব এবং দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে পতিত হয়ে অকালে প্রাণ হারায় হাজারো নিরীহ মানুষ। এর পাশাপাশি যুক্ত হয় রক্ষীবাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এমন দুঃশাসন ও চরম খাদ্যাভাবের মাঝে দেশের সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা, তখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে জাসদের সহিংস ও জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির উত্থান দেশের অস্তিত্বকেই এক ভয়ানক হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। চারদিকে যখন কেবলই হতাশা, ভয় আর আতঙ্ক বিরাজ করছে, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ঘটনার পরিক্রমায় ইতিহাসের পাদপ্রদীপে চলে আসে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টির সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটির সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যের বিষয়টি গভীরভাবে উঠে এসেছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি বিশাল। নির্দিষ্ট কোনো সময়ের গণ্ডিতে এই দিনটিকে আবদ্ধ করে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। আজ বাংলাদেশ যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তার একটি সুদৃঢ় ভিত্তি রচিত হয়েছিল মূলত এই ৭ নভেম্বরেই। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সারাদেশের মানুষ এক অভাবনীয় ঐক্যের মোহনায় মিলিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ তার নিজের চলার সঠিক পথটি খুঁজে পেয়েছিল। ৩ নভেম্বর সামরিক কর্মকর্তা ও ক্ষণস্থায়ী সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে। এই ঘটনাপ্রবাহের মূল চরিত্র ছিলেন তিনজন—খালেদ মোশাররফ, জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। কিন্তু ৭ নভেম্বরের চূড়ান্ত অঙ্কে এসে সিপাহী ও আপামর জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে জিয়াউর রহমানই এই বিপ্লবের মূল নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব এবং সাধারণ মানুষের চাহিদার সাথে তাল মেলাতে না পারায় ষড়যন্ত্রের দায় কাঁধে নিয়ে ইতিহাসের দৃশ্যপট থেকে ছিটকে পড়েন খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহের। স্বাধীনতার পর যখন জাতি নানা রাজনৈতিক ধারায় মারাত্মকভাবে বিভাজিত, ঠিক তখনই জাতি গঠনে এক সুদৃঢ় ঐক্যের ডাক নিয়ে রাজনীতির মঞ্চে দৃশ্যমান হন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান।

স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের আগে থেকেই এক অগাধ আস্থা ও প্রবল জনপ্রিয়তা ছিল। বিপরীতে মানুষ দেখেছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করার প্রবণতা এবং জাসদের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, জাসদের এককভাবে কোনো অভ্যুত্থান সংগঠিত করার জনভিত্তি বা ক্ষমতা ছিল না। ফলে জাসদ ও কর্নেল তাহের মূলত জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সিপাহী-জনতা জিয়াউর রহমানকেই তাদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। তাঁর অভাবনীয় গ্রহণযোগ্যতার কাছে কর্নেল তাহেরের সকল পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়েই দেশের রাজনীতিতে জাসদের উত্থানের সব সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়ে যায়। এই বিপ্লবের পরপরই জিয়াউর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। তিনি প্রথমেই দেশের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকে গভীর নজর দেন। বাকশালের প্রবর্তিত কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত উদার মুক্তবাজার ব্যবস্থার দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনীতির দুয়ার সহজ করে দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় নজরদারিও বজায় রাখেন তিনি। তাঁর আমলেই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওগুলো নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়, যার ফলে বিপুল পরিমাণ উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ দেশে প্রবেশ করে। ক্ষুদ্র ঋণের বিকাশ ও নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জিয়াউর রহমান রাজনীতিকেও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তাঁর আমলেই বাকশালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ পুনরায় নিজেদের নামে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ লাভ করে। একই সঙ্গে অন্যান্য দলের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও রাজনীতিতে ফেরা শুরু করে। জিয়াউর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই পদক্ষেপগুলো এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছিল, যখন সমগ্র বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের জয়জয়কার চলছিল। ব্রাজিলে এক দশকের সামরিক শাসন, চিলিতে সালভাদর আয়েন্দেকে হটিয়ে পিনোশের ক্ষমতা দখল, আর্জেন্টিনায় হোর্হে ভিদালের শাসন এবং লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া ও ইরাকে লৌহমানবদের আধিপত্যের সেই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী থেকে এসেও জিয়াউর রহমান নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেবে প্রমাণ করেন। রণাঙ্গনের এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা চরম অস্থিরতা দমন করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে দেশকে প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যান। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে হতবিহ্বল জাতিকে যিনি ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছিলেন, সেই সাহসের ওপর ভর করেই তিনি ৭ নভেম্বর দেশের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

স্বাধীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল মূলত ৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের হাত ধরেই। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর সমগ্র দেশের মানুষ আবার একটি অভিন্ন মোহনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এই দিনে। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই একটি অবিস্মরণীয় ঐক্যের প্রতীক, আর সেই ঐক্যের মহানায়ক হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}