দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে চলমান হামলা, ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির নেপথ্যে যারা কলকাঠি নাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের আপামর জনতা যেভাবে অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উচিত জবাব দিয়েছিল, এবারও শিল্পখাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ঠিক একইভাবে প্রতিহত করা হবে। আজ দুপুরে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন। দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকদের কল্যাণে বর্তমান সরকারের গৃহীত নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, জনগণের সরকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তা নস্যাৎ করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিগত ১৫ থেকে ১৬ বছরের দুঃশাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অভিযোগ করেন, যারা দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থেকেও দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন করতে পারেনি, যারা মানুষের মৌলিক ভোটাধিকার হরণ করেছিল এবং দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ বিদেশে পাচার করেছিল, তারাই আজ নতুন করে ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুখে যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল, আজ তারা সীমান্তের ওপার থেকে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রকারীরা সুপরিকল্পিতভাবে দেশের মিল-কারখানাগুলো ধ্বংস করে দিতে চাইছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ এবং শ্রমিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
কারখানাগুলোকে দেশের অর্থনীতি ও শ্রমিকদের প্রাণভোমরা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মিল-কারখানাগুলো দেশের অমূল্য সম্পদ, এগুলো এদেশের শ্রমিকদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। কোনো ষড়যন্ত্রের ফলে যদি এসব কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়, তবে এর সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ শ্রমিক ভাই-বোন এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। বর্তমান সরকার শ্রমিকদের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে যেসব যৌক্তিক দাবি-দাওয়া রয়েছে, তা সরকার গভীরভাবে অনুধাবন করছে। ইতোমধ্যে শ্রমিকদের সার্বিক দিক বিবেচনা করে একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে, যা পুরোদমে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই এই বোর্ড একটি সম্মানজনক নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করবে, যার মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিল্প খাতের প্রসার ও দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে। বিএনপি অতীতে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার এখন তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। সারাদেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন কারখানা পুনরায় চালু করার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একসময়ের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল খুলনার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি জানান, খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা থেকে শুরু করে উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে দেশের তরুণ ও যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
এর আগে, আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী মোংলায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এবং চীনের স্বনামধন্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর তিনি মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দেশের সমুদ্র বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন। কাটাখালীর পথসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং পরবর্তীতে খুলনায় অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন।
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে সরকারের বর্তমান পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী। শিল্প খাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় অবস্থান দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ কারখানা চালুর এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের অর্থনীতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।