Views: 1

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের শাসনক্ষমতার শীর্ষে থাকা এবং পশ্চিমাদের ঘোষিত প্রধান শত্রু আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা ৮৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার প্রথম দফাতেই প্রাণ হারান। রোববার দ্বিতীয় দিনেও এই হামলা অব্যাহত রয়েছে, কারণ উভয় দেশই বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন বা উৎখাতের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার পাম বিচ থেকে এএফপি জানিয়েছে, রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে তাকে ‘ইতিহাসের অন্যতম দুষ্ট ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন।

ইসরায়েল থেকে খামেনির মৃত্যুর খবর প্রথম প্রচার হওয়ার পর তেহরানের রাস্তায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যেখানে কিছু স্থানে উল্লাসধ্বনি শোনা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, খামেনির বাসভবন সংলগ্ন এলাকা থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য যে, এই হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, যাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। রোববার ভোরেও তেহরানের আকাশ জোরালো বিস্ফোরণের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন না হওয়া পর্যন্ত এই সামরিক অভিযান বন্ধ হবে না। তিনি ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি ইরানি জনগণের জন্য তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের একক বৃহত্তম সুযোগ। একইভাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যার ফলে আবুধাবিতে দুইজন এবং তেল আবিবে একজন নিহত হয়েছেন। পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোও এই পাল্টাপাল্টি হামলায় কেঁপে উঠেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, খামেনির পাশাপাশি তার শীর্ষ উপদেষ্টা আলি শামখানি এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুরও নিহত হয়েছেন। ইরানি গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, হামলায় খামেনির পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য, যার মধ্যে তার কন্যা, জামাতা ও নাতনি রয়েছেন, তারাও প্রাণ হারিয়েছেন। তবে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি বেঁচে আছেন এবং তিনি এই হামলার কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক অত্যাচারীদের কাজ হিসেবে বর্ণনা করে তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা দেন।

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও জল্পনা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ডের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহর পুত্র রেজা পাহলভী সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ব্যবস্থার ভেতর থেকে আসা যেকোনো উত্তরসূরি অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। তিনি ইরানিদের সতর্ক থাকার এবং উপযুক্ত সময়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনে নির্বাসনে থাকা পাহলভী নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে উত্তরণের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এদিকে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, চলমান হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ২০১ জন নিহত এবং ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে হামলায় ১০৮ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও এএফপি তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বেসামরিক চলাচলের জন্য প্রায় বন্ধ রয়েছে এবং এই অভিযানকে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু এবং তেহরানে চলমান এই ভয়াবহ সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত ইরান ও বিশ্ব মানচিত্রে কী পরিবর্তন আনে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।