Views: 1

মশা—ছোট্ট একটি পতঙ্গ, কিন্তু আজ এটি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য এক জীবন্ত অভিশাপের নাম। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া আর চিকনগুনিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগের বাহক এই পতঙ্গটি এখন কেবল শহর নয়, বরং গ্রাম-গঞ্জের প্রতিটি নিভৃত কোণকেও মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছে।

গত দুই বছর ধরে মশক নিধনে সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা এবং চরম অব্যবস্থাপনা আজ দেশজুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। রক্তচোষা এই কীটের অত্যাচারে মানুষ থেকে শুরু করে গৃহপালিত পশুপাখি—কেউই নিরাপদ নয়। অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যেন কুম্ভকর্ণের ঘুমে আচ্ছন্ন। মশক নিধনের দায়ভার কেবল একটি দপ্তরের নয়, বরং এখানে ব্যর্থতার পাল্লা অনেক ভারী।

সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো তাদের প্রধান দায়িত্ব—ফগার মেশিন দিয়ে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো এবং ড্রেন পরিষ্কার রাখা—তাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মশক নিধন ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তারা বছরের পর বছর নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহার করে জনরোষের মুখে পড়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ (খএউ) মশক নিধনের বাজেট দিলেও তার সঠিক তদারকি ও মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারেনি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (উএঐঝ) কেবল আক্রান্তদের পরিসংখ্যান দিতেই ব্যস্ত, কিন্তু প্রাদুর্ভাবের আগে সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কাজে তাদের সক্রিয়তা ছিল নামমাত্র। এছাড়া ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাশয় ও বদ্ধ খালগুলো পরিষ্কার না রাখায় সেগুলো এখন মশার উন্মুক্ত প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে জমে থাকা পানির ব্যাপারে তদারকি না করায় এডিস মশার বিস্তার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা শিল্পাঞ্চলটিকে মশার স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। মশার এই ভয়াবহতা নিয়ে আমরা কথা বলেছি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ এবং ২ জন বিশেষজ্ঞের সাথে।

তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এক চরম হতাশার চিত্র: ১. রাবেয়া খাতুন (গৃহিণী, গাজীপুর): “সন্ধ্যা হলে ঘরে থাকা যায় না। কয়েল জ্বালিয়েও কাজ হয় না। ছোট বাচ্চাটা কাল থেকে জ্বরে ভুগছে। সিটি কর্পোরেশনের লোকজনকে গত এক বছরেও ওষুধ ছিটাতে দেখিনি।” ২. আব্দুল মালেক (রিকশাচালক, ঢাকা): “সারাদিন খাটুনি দিয়ে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাব তার উপায় নেই। মশারি টাঙালেও ভেতরে মশা ঢুকে পড়ে।

আমাদের মতো গরিবের দেখার কেউ নেই।” ৩. রফিকুল ইসলাম (খামারি, ময়মনসিংহ): “মশার কামড়ে গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দুধ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। পশুর যন্ত্রণায় আমাদেরও জীবন ওষ্ঠাগত।” ৪. সুমি আক্তার (শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম): “পড়াশোনায় মন বসানো যাচ্ছে না। মশার উৎপাতে টেবিল ছেড়ে মশারির ভেতরে গিয়ে পড়তে হয়। এলাকায় মশা মারার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।” ৫. জহিরুল আলম (ব্যবসায়ী, সিলেট): “প্রতিদিন দোকানে কয়েল জ্বালাতে হয়। কয়েলের ধোঁয়ায় সর্দি-কাশি লেগেই আছে। সরকার ট্যাক্স নেয় কিন্তু মশা মারার ক্ষমতা নেই।”

৬. ডা. মাহফুজুর রহমান (চিকিৎসক, পাবনা): “হাসপাতালে প্রতিদিনই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগী আসছে। এর জন্য সরাসরি প্রশাসনের উদাসীনতা দায়ী।”

৭. আসলাম হোসেন (দিনমজুর, বরিশাল): “গরিব মানুষ মশারিতে ঘুমালেও কয়েল কেনার টাকা নেই। সরকারি দপ্তরগুলো কবে জাগবে?”

৮. মরিয়ম বেগম (পোশাককর্মী, গাজীপুর): “গাজীপুরে ময়লা-আবর্জনা আর ড্রেনের অবস্থা খুব খারাপ। এখান থেকেই মশা তৈরি হচ্ছে। আমরা নিয়মিত অসুস্থ হচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞের বক্তব্য: ডা. মুশতাক হোসেন (জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ): “মশক নিধন কেবল স্প্রে করার বিষয় নয়। এটি একটি বছরব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ। সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ফগার মেশিনে যে তেল ছিটানো হয়, অনেক ক্ষেত্রে মশা তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে। আধুনিক লার্ভিসাইড ব্যবহার জরুরি।”

অধ্যাপক কবিরুল বাশার (কীটতত্ত্ববিদ): “আমরা বারবার বলছি লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। উড়ন্ত মশা মেরে কোনো লাভ নেই যদি না প্রজনন উৎস ধ্বংস করা হয়। সরকারি দপ্তরগুলোর অবহেলার কারণে আজ মশা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।”

মশার কামড়ে আক্রান্ত মানুষের পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, এটি প্রতিটি পরিবারের জন্য এক একটি শোকের গল্প। ডেঙ্গু জ্বরের প্লাটিলেট কমে যাওয়া, ম্যালেরিয়ার তীব্র কাঁপুনি আর গোদ রোগের অভিশাপ আজ গ্রাম ও শহরের ফারাক মুছে দিয়েছে। গাজীপুর মহানগরের ডাস্টবিন ও অপরিকল্পিত ড্রেনগুলো আজ একেকটি ‘মশা উৎপাদন কারখানা’। গত দুই বছরে মশক নিধন বাজেট কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকার যদি এখনই ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু না করে, তবে আগামী বর্ষা মৌসুমে মৃত্যু মিছিল ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

১. সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাকে প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ফগার মেশিন ও লার্ভিসাইড ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

২. মশক নিধন ওষুধের গুণগত মান আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে তবেই ব্যবহার করতে হবে।

৩. জলাশয়, খাল ও বদ্ধ ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য ওযাসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কঠোর নির্দেশ দিতে হবে।

৪. প্রতিটি জেলায় মশক নিধনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।

৫. জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘বাড়ি পরিষ্কার অভিযান’ জোরদার করতে হবে। মশা মারতে কামান দাগার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা আর জবাবদিহিতা। সরকারি দপ্তরগুলো যদি নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করত, তবে আজ জাতিকে এই মশা-যন্ত্রণায় ধুঁকতে হতো না। আমরা আশা করি, এই নিউজের চাপে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ঘুম ভাঙবে এবং দেশজুড়ে দ্রুত কার্যকর মশক নিধন অভিযান শুরু হবে। অন্যথায়, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যর্থতার দায় নিয়ে দপ্তরগুলোকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।