Views: 2

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে নজিরবিহীন রক্তপাত ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় আওয়ামী লীগের অতীতের দীর্ঘ রাজনৈতিক অর্জন আজ ম্লান হয়ে পড়েছে। গত ৫ আগস্ট দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে শীর্ষ নেতাদের অন্তরালে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে আন্দোলনের সময় পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সরাসরি রাজপথে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি দলটিকে চরম জনরোষের মুখে ফেলেছে। যার প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে সম্প্রতি দেশের দু-একটি স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় পুনরায় খোলার চেষ্টা এবং বিচ্ছিন্ন ঝটিকা মিছিলের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিএনপি নেতৃত্বের মাঝে এই পরিস্থিতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এ প্রসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম যেহেতু আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাই এটি দেখার দায়িত্ব মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। বিএনপি কোনো জোর-জবরদস্তি করে এটি থামাতে যাবে না, আবার কেউ আইন ভঙ্গ করুক সেটাও দল সমর্থন করে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধ, ধ্বংসাত্মক কাজ বা বড় ধরনের দুর্নীতিতে লিপ্ত হননি, তাদের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে প্রশাসনের বাধা দেওয়ার কিছু নেই। বিএনপি নিজেদের বহুদলীয় গণতন্ত্রের রূপকার হিসেবে দেখে এবং মনে করে কোনো দলকে রাজনীতি থেকে বয়কট বা ফিরিয়ে আনার চূড়ান্ত দায়িত্ব জনগণের।

অন্যদিকে, একাডেমিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে কেবল আইনি কাঠামো দিয়ে বিচারের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করেন, আইনের পরিবর্তন বা নতুন অধ্যাদেশ হলো সমাজের উপরিভাগের কাঠামো, যা সাধারণ নাগরিকের মনস্তত্ত্বকে সরাসরি স্পর্শ করে না। জুলাই পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ তাদের চাহিদার প্রতিফলন কতটা পাচ্ছে এবং তাদের জীবনে ইতিবাচক কী প্রভাব পড়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই জুলাই বিপ্লবের মূল্যায়ন হবে। একে তিনি ‘সামাজিকীকরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক রাখতে হলে কেবল আইনি ব্যবস্থা নয়, বরং সামাজিকভাবে দলটিকে মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরীর মতে, ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য এবং স্বজনহারাদের কান্নাকাটি মানুষের মনস্তত্ত্বে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দেশের রাজনীতিতে নৈতিকভাবে ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না। বর্তমানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক অবস্থায় থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সরবতা মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে। তবে দেশের মাটিতে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি এখনো শূন্যের কোঠায়। চব্বিশের বিপ্লবের পক্ষ শক্তিগুলোর দায়িত্ব হবে এই গণহত্যার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিচার নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন স্বৈরাচারী পরিবেশের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়টি এখন কেবল আইনি জটিলতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নৈতিকতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বড় এক পরীক্ষা। জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের বিচার এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের সফলতাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক মানচিত্র কেমন হবে।