Views: 4

আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই মাহেন্দ্রক্ষণেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে (যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হিসেবে পরিচিত) এক বিশাল জনসভায় বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার সেই বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বঙ্গবন্ধুর এই একটি মাত্র ভাষণই পুরো জাতিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল এবং পাকিস্তানের শোষণ ও নিষ্পেশন থেকে মুক্তির মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল।

একাত্তরের সেই ৭ই মার্চের দিনটিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা ছিল এক মিছিলের শহর। সকাল থেকেই ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ হেঁটে, বাসে, লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে রেসকোর্স ময়দানের দিকে সমবেত হতে থাকেন। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের পদভারে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সেই বিশাল ময়দান। মানুষের সেই অভূতপূর্ব ঢল দেখে মনে হয়েছিল যেন বিশাল এক জনসমুদ্র সেখানে আছড়ে পড়ছে। গ্রাম-বাংলা থেকে আসা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক, সকলের চোখেই ছিল মুক্তির স্বপ্ন এবং কানে ছিল প্রিয় নেতার নির্দেশ শোনার ব্যাকুলতা। সেদিন বিকেলের সেই ১৮ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু কেবল মুক্তির ডাকই দেননি, বরং আসন্ন গেরিলা যুদ্ধের জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কলাকৌশলও শিখিয়ে দিয়েছিলেন।

ইতিহাসের সেই উত্তাল দিনটিতে বঙ্গবন্ধুর মুখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা। সেই দৃপ্ত উচ্চারণ কেবল রেসকোর্স ময়দান নয়, বরং টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ভাষণ হিসেবে স্বীকৃত, যা পরবর্তীতে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। এটি ছিল কার্যত একটি অলিখিত স্বাধীনতার ঘোষণা, যা নিরস্ত্র বাঙালিকে একটি সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেছিল এবং মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছিলাম আমাদের লাল-সবুজের পতাকা।

আজকের এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে সেই কালজয়ী ভাষণ এবং এর মহানায়ককে। ৭ই মার্চের চেতনা আজও আমাদের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে প্রেরণা যোগায়। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই দিনের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটিই আমাদের আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা এই দিনটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন অব্যাহত রয়েছে।

৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি ভাষণ নয়, এটি একটি জাতির জন্মকথা। বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠের নির্দেশনা আজও আমাদের জাতীয় জীবনে সঠিক পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। এই ঐতিহাসিক দিবসের চেতনাকে ধারণ করেই আমাদের আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।