Views: 5
পার্বত্য জনপদ রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার শিলছড়ি মহাজন মার্মা পাড়ায় দীর্ঘকাল ধরে বিরাজমান তীব্র পানির সংকটের অবসান ঘটেছে। পাহাড়ি এই জনপদে বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী কোনো উৎস না থাকায় কয়েক দশক ধরে যে মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভোগ চলছিল, আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পন্ন করার মাধ্যমে তার ইতি টানা হয়েছে। গত শুক্রবার (৬ মার্চ) আনুষ্ঠানিকভাবে এই পানি প্রকল্পের উদ্বোধন করে তা জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই মহতী উদ্যোগের ফলে দুর্গম এই এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে এক অভূতপূর্ব স্বস্তি ও আনন্দের জোয়ার বইছে। দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা মেটানোর এই আয়োজনে মার্মা সম্প্রদায়ের প্রতিটি ঘরে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
পানির এই বিশেষ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কাপ্তাই উপজেলার দূরদর্শী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন। ফিতা কেটে ও জলধারা উন্মুক্ত করে তিনি এই প্রকল্পের সূচনা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও রুহুল আমিন পানির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “পানির অপর নাম জীবন। আধুনিক সভ্যতায় মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে নিরাপদ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একটি অপরিহার্য রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।” তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন এই সুপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিলছড়ি মহাজন মার্মা পাড়ার প্রান্তিক বাসিন্দাদের যে অবর্ণনীয় কষ্ট ছিল, তা চিরতরে লাঘব হবে। সরকারি এই উদ্যোগের মাধ্যমে পাহাড়ি জনপদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ হলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এক বিশেষ গুরুত্ববহ পরিবেশ তৈরি হয় যখন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কাপ্তাইয়ের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জাফর আহমেদ স্বপন, আনোয়ার হোসেন, ডালিম এবং মফিজসহ স্থানীয় মুরুব্বিগণ। উপস্থিত সুধীজনরা এই প্রকল্পের কারিগরি দিক এবং স্থায়িত্ব নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা মনে করেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া দুঃসাধ্য, সেখানে এমন একটি সুশৃঙ্খল পানি বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল।
স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিলছড়ি মহাজন মার্মা পাড়ায় প্রায় ৬৯টি পরিবার বসবাস করে। দীর্ঘ সময় ধরে এখানে বিশুদ্ধ পানির কোনো স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল না। পাড়ার নারী ও শিশুদের মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি ঝর্ণা বা দূরবর্তী কূয়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এই হাহাকার আরও প্রকট হয়ে উঠত। নতুন এই পানি ব্যবস্থাপনা চালু হওয়ায় এখন তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে নিরাপদ পানি। এতে করে কেবল তৃষ্ণা মেটানোই নয়, বরং পানিবাহিত রোগ থেকেও রক্ষা পাবে এই জনপদ। এলাকার বাসিন্দারা এই সময়োপযোগী উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশেষ সহযোগিতা করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিনসহ সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি দপ্তরের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
পাহাড়ি জনপদে উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় ছিল সুপেয় পানির অভাব। কাপ্তাইয়ের শিলছড়ি মহাজন মার্মা পাড়ায় এই পানি প্রকল্পের উদ্বোধন কেবল একটি অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং এটি একটি জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিফলন। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি দুর্গম পাড়ায় অচিরেই পানির হাহাকার দূর হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা।