Views: 4
বাংলাদেশে গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি তেল নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাকে এক কথায় ‘তেলেসমাতি’ বললেও কম বলা হয়। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড আর সাধারণ মানুষের হাহাকার—সব মিলিয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি। সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন: দেশে কি আসলেই তেলের সংকট, নাকি এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো সিন্ডিকেটের খেলা?
উৎপাদন না কি আমদানি: সমীকরণের অলিগলি
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ কি জ্বালানি তেল উৎপাদন করে? উত্তরটি কিছুটা মিশ্র। বাংলাদেশে মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় উপজাত হিসেবে ‘কনডেনসেট’ পাওয়া যায়। এই কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল এবং সামান্য পরিমাণ অকটেন উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমানে দেশের পেট্রোলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ এই উৎস থেকে মেটানো হয়। কিন্তু অকটেন এবং ডিজেলের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। অকটেনের চাহিদার একটি বড় অংশ এবং ডিজেলের প্রায় ১০০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অর্থাৎ, পেট্রোলে আমরা অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ডিজেল ও অকটেনের জন্য আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভর করতেই হয়।
কেন এই হাহাকার?
ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল না পাওয়ার পেছনে কয়েকটি স্তরে সমস্যা কাজ করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। দ্বিতীয়ত, পরিবহণ ধর্মঘট বা সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত ঘটলে পাম্পগুলোতে দ্রুত স্টক শেষ হয়ে যায়।
তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গাটি হলো ‘সিন্ডিকেট’। যখনই তেলের দাম বাড়ার গুজব ছড়ায় বা আমদানিতে সামান্য টান পড়ে, তখনই একদল অসাধু ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিক তেল মজুদ করা শুরু করেন। বেশি লাভের আশায় তারা পাম্পের নজল বন্ধ করে দেন, ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ যখন দেখছে আজ তেল না নিলে কাল পাওয়া যাবে না, তখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করার এক ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত ক্রয়ের হিড়িক পড়ে যায়, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করে।
উত্তরণের পথ ও সমাধান
এই তেলেসমাতি বন্ধ করতে হলে সরকারকে কঠোর ও বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে:
তদারকি ও অভিযান: বিপিএসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত পাম্পগুলোতে ঝটিকা অভিযান চালাতে হবে। মজুদদারি প্রমাণ হলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডলার সংকটের স্থায়ী সমাধান: জ্বালানি আমদানির জন্য এলসি (লেটার অফ ক্রেডিট) খোলার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে যাতে আমদানির চেইন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।
বিকল্প জ্বালানির প্রসার: আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। কনডেনসেট থেকে তেল উৎপাদনের রিফাইনারিগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রবাহ: বাজারে তেলের মজুদ কতটুকু আছে এবং পরবর্তী জাহাজ কবে আসবে—এসব তথ্য নিয়মিত সরকারিভাবে প্রচার করতে হবে। সঠিক তথ্যের অভাবই গুজবের জন্ম দেয় এবং সিন্ডিকেটকে সুবিধা করে দেয়।
জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের মতো। এখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে পুরো পরিবহণ ও কৃষি খাত স্থবির হয়ে পড়ে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের দামের ওপর। তাই সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস কমাতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই ‘তেলেসমাতি’র অবসান জরুরি। কেবল কঠোর নিয়ন্ত্রণ আর স্বচ্ছতাই পারে এই হাহাকার দূর করতে।