Views: 4
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা বর্তমানে অনেকটা মহামারিতে রূপ নিয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে একশোর বেশি আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে। ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের কিডনি ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডকে সাময়িকভাবে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে গাদাগাদি করে মেঝেতে রেখেই শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য হাসপাতালে কোনো আইসিইউ সুবিধা না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মনে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১২ দিনেই ১৩০ জন হাম আক্রান্ত শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৭ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৩১ জন ছেলে এবং ৬ জন মেয়ে শিশু। গত ৩ মাসে জেলা হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চারজন শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে রোগীর স্বজনদের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই চার শিশুর মৃত্যু হয়।
বর্তমানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। শরিফা বেগম ও রফিকুল ইসলামের মতো অনেক অভিভাবক তাদের শিশুদের নিয়ে হাসপাতালের বারান্দা, সিঁড়ির নিচে এমনকি কনকনে ঠান্ডার মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন। ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় চিকিৎসকরা বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ দিলেও গাদাগাদি করে থাকার ফলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানিয়েছেন, চিকিৎসক ও নার্স সংকটের কারণে সেবা দিতে তারা চরম হিমশিম খাচ্ছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন জায়গা থেকে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ যা হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। এর ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং চোখের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ মাহফুজ রায়হান জানান, টিকাদানে অনিহার কারণে এই প্রকোপ বাড়ছে। তিনি ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলার দুটি ডোজ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, ২০১৯ সালের পর ২০২৪ সালে হাম প্রতিরোধের বিশেষ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো হয়নি। তবে আগামী এপ্রিল বা মে মাসে এই ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত ও ভ্যাকসিনের আওতায় আনার কাজ করছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। হাসপাতালের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। শিশুদের সুস্থতায় অভিভাবক ও স্বাস্থ্য বিভাগকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।