হিলিতে অসময়ে মাচায় তরমুজ চাষ: প্রথমবারেই লাখপতি কৃষক আতিয়ার

প্রতিবেদক: নুরুজ্জামান হোসেন, হিলি (দিনাজপুর) প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৫৪ অপরাহ্ণ
হিলিতে অসময়ে মাচায় তরমুজ চাষ: প্রথমবারেই লাখপতি কৃষক আতিয়ার
৪৪

দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী হাকিমপুর উপজেলার হিলিতে প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয়ে অসময়ে মাচায় তরমুজ চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন আতিয়ার রহমান নামের এক দূরদর্শী কৃষক। গতানুগতিক চাষাবাদের বিপরীতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মৌসুমে মাচাপদ্ধতিতে প্রথমবারের মতো তরমুজ চাষ করেই তিনি লাখপতি হওয়ার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণিত হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে তরমুজের আবাদ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন তিনি। এদিকে আতিয়ারের এমন চোখধাঁধানো সাফল্য ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা দেখে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অসংখ্য কৃষক এখন অসময়ের এই অর্থকরী ফসল চাষে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ ও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকদের এমন সম্ভাবনাময় উদ্যোগে উপজেলা কৃষি বিভাগও সব ধরনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

সরেজমিনে হিলির খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত বলরামপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাচাজুড়ে ঝুলছে চোখজুড়ানো গাড় সবুজ রঙের তরমুজ। কৃষক আতিয়ার রহমান স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় একটি প্রদর্শনী প্লট হিসেবে প্রথমবারের মতো নিজের ৪০ শতাংশ জমিতে এই আধুনিক মাচাপদ্ধতিতে তরমুজ চাষ শুরু করেন। তিনি মূলত উচ্চ তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত সহনশীল এবং অধিক ফলনশীল ‘বেঙ্গল টাইগার’ জাতের তরমুজ আবাদ করেছেন। চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করায় প্রতিটি গাছেই আশাতীত ফলন এসেছে। মাচায় ঝুলন্ত তরমুজগুলো পরিপূর্ণভাবে পরিপক্ব হতে শুরু করায় তিনি ইতিমধ্যে নিয়মিতভাবে তা সংগ্রহ করে বাজারজাতকরণের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বীজ রোপণ করার মাত্র ৭০ দিনের মাথায় সম্পূর্ণ ফলন ঘরে তোলা সম্ভব হওয়ায় এই চাষে কৃষকের শ্রম ও সময়ের দারুণ সাশ্রয় ঘটছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, উৎপাদিত ফসল বিক্রি নিয়ে কোনো ধরনের বিপাকে পড়তে হচ্ছে না; বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি ফসলের জমিতে এসে নগদ মূল্যে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

সফল তরমুজচাষি আতিয়ার রহমান অত্যন্ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করে জানান, বীজ বপন, মাচা তৈরি, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং নিয়মিত পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত তার সর্বমোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে তিনি মাঠপর্যায়ে প্রতি মণ তরমুজ এক হাজার ছয়শত টাকা দরে পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। বিক্রির প্রথম কিস্তিতেই তিনি এক লাখ ২৫ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করে নিজের প্রাথমিক খরচের দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ তুলে নেন এবং প্রথম প্রয়াসেই সরাসরি লাখপতির খাতায় নাম লেখান। তিনি আরও জানান, জমিতে এখনো বিপুল পরিমাণ পরিপক্ব তরমুজ অবশিষ্ট রয়েছে, যা বিক্রির পর মোট আয়ের পরিমাণ অনায়াসেই দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। প্রচলিত ধান চাষের তুলনায় স্বল্প সময়ে কয়েক গুণ বেশি মুনাফা অর্জিত হওয়ায় আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে এই তরমুজ চাষ করার সংকল্প করেছেন তিনি।

আতিয়ারের এই সাফল্য কেবল তার নিজের ভাগ্যবদলই করেনি, বরং স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। কথা হয় এলাকার বেশ কয়েকজন স্থানীয় যুবকের সঙ্গে; তারা জানান যে আতিয়ারের এই তরমুজ বাগানে নিয়মিত পরিচর্যা ও ফসল তোলার কাজে যুক্ত হয়ে অনেকেরই দীর্ঘদিনের বেকারত্ব ঘুচেছে। কর্মসংস্থানের এমন নতুন দুয়ার উন্মোচিত হওয়ায় গ্রামের তরুণ ও কৃষিজীবীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে এবং অনেকেই এখন আতিয়ারের পথ অনুসরণ করে তরমুজ চাষে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম জানান, মাচায় উচ্চমূল্যের তরমুজ চাষে কৃষকদের সার্বিক কারিগরি সহায়তা, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও নিবিড় পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। অসময়ের পুষ্টিকর এই ফল চাষের ফলে কৃষকরা যেমন ব্যাপক অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষের পুষ্টি চাহিদাও কার্যকরভাবে পূরণ হচ্ছে। তিনি তথ্য দিয়ে জানান, হিলিতে চলতি মৌসুমে মোট ৩ হেক্টর জমিতে মাচায় এই তরমুজের সফল আবাদ হয়েছে। স্বল্প মেয়াদে ব্যাপক লাভজনক প্রমাণিত হওয়ায় আগামীতে এই অঞ্চলে মাচায় তরমুজ চাষের পরিধি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ ও ফসলের বহুমুখীকরণ যে প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে, হিলির কৃষক আতিয়ার রহমানের অসময়ে মাচায় তরমুজ চাষ তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিকূল আবহাওয়া সহনশীল জাতের সম্প্রসারণ এবং মাচাপদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ব্যবহার গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিকে এক নতুন সম্ভাবনার পথে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের ধারাবাহিক তদারকি, উন্নত বীজের সহজলভ্যতা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষিখাতে এমন উদ্ভাবনী উদ্যোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এবং বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

Download Photocard

Polls

আজকের প্রশ্ন

আপনি বাংলা নিউজ টিভির পেইজে লাইক ফলো দিয়েছেন কি?

View Results

Loading ... Loading ...