উখিয়ার কৃষি কি তবে বর্জ্যের তলায় হারিয়ে যাবে?

মোঃ হারুন অর রশিদ, উখিয়া উপজেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ২:২৯ অপরাহ্ণ
উখিয়ার কৃষি কি তবে বর্জ্যের তলায় হারিয়ে যাবে?
১৩১

উখিয়ার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখন আর সবুজ নেই। বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় বা মহাপ্লাবন নয়, স্রেফ স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই পাহাড় থেকে নেমে আসা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য গিলে খাচ্ছে স্থানীয় কৃষকদের স্বপ্ন। মাঠজুড়ে পলিথিন, চিপসের প্যাকেট আর পচা আবর্জনা। কালচে পানি আর তীব্র দুর্গন্ধে বিষিয়ে উঠছে বাতাস। স্থানীয় কৃষকদের মতে, প্লাস্টিকের আস্তরণ আর রাসায়নিক মিশ্রিত নোংরা পানিতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে—কৃষক ভাষায় মাটি এখন ‘মৃত’।

‎রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন “প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার এলাকা পরিদর্শন করছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শুধু দেখতে আসা আর আশ্বাস দেওয়া দিয়ে তো কৃষকের পেট চলবে না। আমাদের প্রশ্ন—বাঁচানোর স্থায়ী উদ্যোগ কোথায়?”

‎ভুক্তভোগী কৃষকদের পক্ষে অধিকার বাস্তবায়ন কমিটি পালংখালীর সহ-সভাপতি এবং হোস্ট কমিউনিটি প্রতিনিধি এস. এম. জি মুফিজ উদ্দিন জানান, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও ও আইএনজিও (বিশেষ করে NRC, ওয়াশ প্রজেক্ট, সাইট ম্যানেজমেন্ট) এবং সিআইসি (CiC) অফিসে বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। এনজিওগুলো ক্যাম্পের ড্রেনগুলো সরাসরি স্থানীয়দের জমি বরাবর তৈরি করে রেখেছে। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই ক্যাম্পের জমাটবদ্ধ প্লাস্টিক ও বর্জ্য এসে কৃষকের সাজানো ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে।”
‎তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর জমি থেকে প্লাস্টিক ও ময়লা সরাতে গিয়ে কৃষকদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি—ক্যাম্পের ড্রেনগুলো সরাসরি জমিতে না ফেলে একটি নির্দিষ্ট খালের সাথে সংযুক্ত করে সুপরিকল্পিত নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

‎উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আসমা জানান: ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ের সঠিক চিত্র তুলে আনতে সরেজমিন পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। বর্জ্য প্রবাহ ঠেকাতে স্থায়ী ‘গাইড ওয়াল’ নির্মাণ এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরির প্রক্রিয়া চলমান। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরগুলোর সাথে সমন্বয় করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

‎উখিয়ার এই করুণ পরিণতির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা:
‎ক্যাম্পে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সংরক্ষণে ঘাটতি।
‎বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথটি সরাসরি কৃষিজমির সাথে যুক্ত।
‎উঁচু স্থান থেকে বর্জ্য সহজেই ঢালের সাথে লোকালয়ে চলে আসা।

‎স্থানীয় কৃষকদের জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। প্রতিবার চাষের আগে জমি থেকে টন টন প্লাস্টিক সরাতে গিয়ে তাদের উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। জমি পরিষ্কারের বাড়তি মজুরি। বিষাক্ত পানির কারণে ফসলের মান ও পরিমাণ হ্রাস। অনেকেই এখন পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার অন্য পথ খুঁজছেন।

‎যদি এখনই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে একটি আধুনিক ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে উখিয়ার ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। স্থানীয়দের দাবি—সাময়িক কোনো লোক দেখানো পরিষ্কার অভিযান নয়, বরং একটি টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরাসরি ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক।

Download Photocard

Polls

আজকের প্রশ্ন

আপনি বাংলা নিউজ টিভির পেইজে লাইক ফলো দিয়েছেন কি?

View Results

Loading ... Loading ...