আদালতের তোয়াক্কা না করে জমি দখলের মরিয়া চেষ্টা: নন্দীগ্রামে আতঙ্কে একটি পরিবার, এলাকায় উত্তেজনা থানায় অভিযোগ
আদালতে মামলা বিচারাধীন, অথচ সেই আইনি প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পৈতৃক জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের তুলাশন গ্রামে। শুধু জমি দখলই নয়, বাধা দেওয়ায় এক প্রবীণ ও তাঁর পরিবারকে গ্রামছাড়া করার হুমকি এবং অবরুদ্ধ করার অপচেষ্টার ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার পর থেকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তুলাশন মৌজার সাবেক ৩৬৫ দাগের ৮৭ শতক ধানী জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় মৃত মুনসুর আলীর ছেলে মোঃ আনোয়ার হোসেন (৫৪)-এর সাথে একই গ্রামের প্রভাবশালী একটি মহলের দীর্ঘদিনের বিরোধ। এই বিরোধের জেরে আনোয়ার হোসেন আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ২০২৪ সালে বগুড়ার বিজ্ঞ আদালতে একটি বন্টন মামলা দায়ের করেন (মামলা নং- ২০৪সি/২০২৪)। আইন অনুযায়ী, বিচারাধীন সম্পত্তির ওপর কোনো পক্ষই স্থিতিাবস্থা (Status Quo) ভঙ্গ করতে পারে না। কিন্তু স্থানীয় একটি চক্র আদালতের সেই নির্দেশনাকে তোয়াক্কা করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
১৫ জুনের সেই উত্তপ্ত সকাল: কী ঘটেছিল সেদিন?
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ১৫ জুন (২০২৬) সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে মামলার বিবাদী মোঃ মাহমুদ (৩৫), মোঃ মাসুদ হোসেন (৪০), মোঃ আঃ হামিদ (৫০) এবং মোঃ আঃ সাত্তার (৬৫)-এর নেতৃত্বে বেশ কিছু লাঠিয়াল বাহিনী দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উক্ত বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রবেশ করে। তারা জমিটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চারপাশ দিয়ে বাঁশের চেগার এবং নেট দিয়ে বেড়া দেওয়া শুরু করে। একই সাথে জমিতে স্থায়ী দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য গাছের চারা রোপণ করতে থাকে।
খবর পেয়ে আনোয়ার হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে আদালতের মামলার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বেড়া দিতে বাধা দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আনোয়ার হোসেন বাধা দেওয়া মাত্রই বিবাদী পক্ষ চরম উগ্র মূর্তি ধারণ করে। তারা বয়োবৃদ্ধ আনোয়ার হোসেনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং মারপিটের জন্য লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে আসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান:
“সেদিন আনোয়ার সাহেব একা ছিলেন। যেভাবে লাঠিয়ালরা তেড়ে এসেছিল, গ্রামের সাধারণ মানুষ এগিয়ে না এলে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে যেতে পারত। মানুষ জড়ো হতে দেখে তারা হুমকি দিতে দিতে চলে যায়।”
জিডির অন্যতম সাক্ষী মোঃ মোখলেছুর রহমান এবং মোঃ আলামিন হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, জমিটি দীর্ঘদিন ধরে আনোয়ার হোসেনেরই ভোগদখলে ছিল। কিন্তু মামলা দায়েরের পর বিবাদী পক্ষ আইনি লড়াইয়ে জিততে না পেরে গায়ের জোরে জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছে। বর্তমানে আনোয়ার হোসেন ও তাঁর পরিবারকে গ্রামে একঘরে করা এবং যেকোনো সময় সুযোগ বুঝে বড় ধরনের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে পুরো পরিবারটি এখন ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে।
এই ঘটনার পর গত ২০ জুন (২০২৬) আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে নন্দীগ্রাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং- ১৪৯৯) ভুক্ত করেন।
বিষয়টি নিয়ে নন্দীগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ তারিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গ্রামীণ জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে যাতে কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ তৎপর রয়েছে। জিডিটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়েছে।
মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে নন্দীগ্রাম থানার এএসআই (নিরস্ত্র) মোঃ গোলাম মোস্তফা সরকারকে। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান,
”আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছি। যেহেতু বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, তাই আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত কেউ জোরপূর্বক দখল বা শান্তি ভঙ্গ করতে পারবে না। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
আইনজীবীদের মতে, আদালতের বিচারাধীন জমিতে এভাবে জোরপূর্বক বেড়া দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগী আনোয়ার হোসেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের এবং তাঁর পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।






