উখিয়ার ওমর মিয়ার ঘোনায় ‘রোহিঙ্গা দিল মোহাম্মদ সিন্ডিকেট’: পাহাড় কাটা, বনভূমি দখল ও অপরাধের সাম্রাজ্য
ক্যাম্পের কাঁটাতার পেরিয়ে সংরক্ষিত বনভূমিতে ডেরা গেড়েছে এক দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্র। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পালংখালী ‘ওমর মিয়ার ঘোনা’ এলাকায় মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক দিল মোহাম্মদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে চুরি, ডাকাতি, পাহাড় কাটা ও বনভূমি দখলের এক বিশাল সাম্রাজ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের নির্ধারিত ক্যাম্প ছেড়ে বনের জায়গায় অবৈধ বসতি গড়ে তুলে পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে এই দিল মোহাম্মদ ও তার সশস্ত্র দোসররা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দুই দশক আগে ২০০৪ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে টেকনাফের সাবরাং এলাকায় আশ্রয় নেয় দিল মোহাম্মদ (পিতা: মৃত আবদুল্লাহ, মাতা: মৃত জুহুরা খাতুন, মূল বাড়ি: লম্বা ঘোনা, মিয়ানমার)। সেখান থেকে কৌশল বদলে প্রায় ১০ বছর আগে সে আস্তানা গাড়ে উখিয়ার পশ্চিম পালংখালী ওমর মিয়ার ঘোনা এলাকায়। স্থানীয় জিয়াজুল হক নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কিনে ও বনবিভাগের পাহাড় কেটে নিজস্ব আস্তানা তৈরি করে সে। সরকারি কোনো বৈধ পরিচয়পত্র বা এনআইডি না থাকলেও দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখল করে বীরদর্পণে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে সে।
বর্তমানে এই দিল মোহাম্মদের আস্তানায় তার পরিবারের সাথে অবস্থান করছে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘আরএসও’ -এর একাধিক সক্রিয় সদস্য। এদের মধ্যে অন্যতম ‘আলিকিন’ নামের এক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। দিল মোহাম্মদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা এলাকাটিতে চুরি, ডাকাতি ও অস্ত্র উঁচিয়ে চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত করছে।
ওমর মিয়ার ঘোনার বিশাল পাহাড় কেটে ও পরিবেশের তোয়াক্কা না করে দিন-রাত মাটি বিক্রি এবং বনের গাছ কেটে সাবাড় করছে এই সিন্ডিকেট। এতে করে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য, অন্যদিকে চরম হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জনজীবন। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে আরএসও সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে উঠে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল হক মেম্বার: “দিল মোহাম্মদ নামের এই রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে ওমর মিয়ার ঘোনা এলাকায় সরকারি বনাঞ্চল দখল করে আস্তানা বানিয়ে আছে। তাদের কারণে এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে। বহিরাগত সন্ত্রাসী ও ক্যাম্পের অপরাধীদের যাতায়াত রয়েছে তার আস্তানায়। বিষয়টি প্রশাসনকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।”
স্থানীয় এক বাসিন্দা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক):”আমরা এখন নিজ ভিটাবাড়িতেও আতঙ্কে থাকি। দিল মোহাম্মদ ও তার সাথে থাকা আলিকিনের মতো সন্ত্রাসীরা রাতে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করে। পাহাড় কেটে বিক্রি করা তাদের প্রধান ব্যবসা। কথা বলতে গেলেই ক্যাম্প থেকে সন্ত্রাসী এনে হামলার হুমকি দেয়।”
বনবিভাগের বিট কর্মকর্তা আরফাত মাহমুদ:”সংরক্ষিত বনভূমির জায়গা দখল করে পাহাড় কাটা ও অবৈধ বসতি স্থাপনের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। বনভূমি রক্ষায় কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। শীঘ্রই এই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
পালংখালী পল্লী বিদ্যুৎ ইনচার্জ রাশেল:”জাতীয় পরিচয়পত্র বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো রোহিঙ্গাদের নামে বিদ্যুতের মিটার দেওয়ার নিয়ম নেই। যদি তারা অবৈধভাবে বা অন্য কারো নামে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অপরাধের আস্তানা পরিচালনা করে থাকে, তবে দ্রুত তদন্ত করে সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।”
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পান্না আক্তার:”সরকারি বনাঞ্চল দখল, পাহাড় কাটা কিংবা রোহিঙ্গা নাগরিকদের ক্যাম্পের বাইরে এসে অপরাধ সংঘটনের কোনো সুযোগ নেই। এই বিষয়ে দ্রুত খোঁজ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বনবিভাগকে সাথে নিয়ে যৌথ অভিযান চালানো হবে। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আইন ভেঙে ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান, সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রদান এবং পরিবেশ ধ্বংস করে বনাঞ্চল দখলের এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উখিয়ার শান্ত পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে ‘রোহিঙ্গা দিল মোহাম্মদ সিন্ডিকেট’-কে গ্রেপ্তার এবং ওমর মিয়ার ঘোনার সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।






