Views: 22
প্রকৃতির রহস্যের যেন শেষ নেই। তাইওয়ানের গহীন বনাঞ্চলের ভেজা পাতা আর হিউমাসের নিচে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত প্রাণীকে নিয়ে দীর্ঘ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ট্যাক্সোনমিক বা শ্রেণিবিন্যাসগত বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছেন একদল গবেষক। ন্যাশনাল তাইওয়ান নরমাল ইউনিভার্সিটির গবেষক সি-মিন লিনের নেতৃত্বে একটি দল প্রমাণ করেছে যে, তাইওয়ানের এই পা-বিহীন টিকটিকি বা ‘লিগলেস লিজার্ড’ আসলে একটি স্বতন্ত্র প্রজাতি। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জুকিজ’-এ (ZooKeys) প্রকাশিত এই গবেষণাটি বিশ্বজুড়ে প্রাণিবিজ্ঞানীদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই অদ্ভুত প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডোপাসিয়া ফরমোসেনসিস’ (Dopasia formosensis)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই প্রাণীর আদি নমুনা বা টাইপ স্পেসিমেনটি হারিয়ে যাওয়ায় এর পরিচয় নিয়ে বিজ্ঞান মহলে সংশয় তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে একে অন্য একটি প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত মনে করা হতো। তবে গবেষক দলটি এখন একটি ‘নিওটাইপ’ বা নতুন শারীরিক নমুনা উপস্থাপনের মাধ্যমে একে স্বতন্ত্র পরিচয় ফিরিয়ে দিয়েছেন। ‘ফরমোসেনসিস’ নামটি এসেছে তাইওয়ানের ঐতিহাসিক পর্তুগিজ নাম ‘ফরমোসা’ থেকে, যার অর্থ হলো ‘সুন্দর দ্বীপ’।
দেখতে হুবহু সাপের মতো হলেও এই পা-বিহীন টিকটিকিগুলোর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এদের সাপ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে। সাপের কোনো কান বা চোখের পাতা থাকে না, কিন্তু এই টিকটিকিগুলোর ছোট কানের ছিদ্র রয়েছে এবং এরা মানুষের মতো চোখের পলক ফেলতে পারে। এদের দেহের দুই পাশে একটি বিশেষ খাঁজ বা ‘ল্যাটারাল ফোল্ড’ থাকে, যা এদের শ্বাস নিতে এবং ডিম বহনের সময় চামড়া প্রসারিত করতে সাহায্য করে। সাধারণত একটি পূর্ণবয়স্ক টিকটিকি ১৭৫ থেকে ২৩০ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, তবে এদের লেজ দেহের দৈর্ঘ্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে প্রাণীটির গায়ের রঙ নিয়ে। এতদিন মনে করা হতো নীল রঙের ছোপ থাকা টিকটিকিগুলো ভিন্ন প্রজাতির। কিন্তু বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে এটি আসলে লিঙ্গভেদে রঙের পার্থক্য বা ‘সেক্সুয়াল ডাইক্রোমাটিজম’। স্ত্রী ও তরুণ টিকটিকিগুলো সাধারণত ব্রোঞ্জ বা তামাটে রঙের হলেও পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের শরীরে উজ্জ্বল নীল রঙের দাগ দেখা যায়, যা সঙ্গী আকর্ষণে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এই প্রাণীরা তাদের ডিমের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘প্যারেন্টাল কেয়ার’ বা অভিভাবকত্ব প্রদর্শন করে, যা সরীসৃপ জগতের জন্য একটি উন্নত সামাজিক আচরণ। নাগরিক বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই রহস্যময় প্রাণীর জীবনধারা এখন বিজ্ঞানের আলোয় নতুনভাবে উদ্ভাসিত।